বাড়ির আশপাশে কিংবা অফিস প্রাঙ্গণে পড়ে থাকা পতিত জমি পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগালে যে তা কতটা ফলপ্রসূ হতে পারে, তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুল ইসলাম। তাঁর উদ্যোগে দিঘলিয়া উপজেলা পরিষদ চত্বরের দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত জমি এখন পরিণত হয়েছে টাটকা ও বিষমুক্ত সবজির এক সবুজ বাগানে।
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে উপজেলা পরিষদ চত্বরে পড়ে থাকা প্রায় ২০ শতাংশ অব্যবহৃত জমিকে চাষাবাদের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেন তৎকালীন ইউএনও মো. আরিফুল ইসলাম। দীর্ঘদিন অনাদরে পড়ে থাকা জমিটি আগাছা ও ময়লায় পরিপূর্ণ ছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী উপজেলা প্রশাসনের কর্মচারী মো. লিয়াকত আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রথমে জমিটি পরিষ্কার করেন এবং পরবর্তীতে চাষের উপযোগী করে তোলেন।
বর্তমানে ওই জমিতে শসা, লাল শাক, বিট, ধনিয়া, বেগুন, টমেটো, পালং শাক, বাঁধাকপি, ফুলকপি ও কচুসহ বিভিন্ন মৌসুমি সবজির চাষ করা হচ্ছে। দিঘলিয়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের নিয়মিত পরামর্শ ও কারিগরি সহযোগিতায় সবজির পরিচর্যা করায় ফলনও হয়েছে বেশ সন্তোষজনক। কীটনাশকমুক্ত এসব সবজি একদিকে যেমন স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যের চাহিদা পূরণ করছে, অন্যদিকে উপজেলা চত্বরের পরিবেশ ও সৌন্দর্যও বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ বিষয়ে দিঘলিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার মো. কিশোর আহমেদ বলেন, “এই উদ্যোগটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে আমরা আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে সবজি উৎপাদনের পরামর্শ দিচ্ছি। কীটনাশকমুক্ত সবজি উৎপাদনের ফলে মানুষ নিরাপদ খাদ্য পাচ্ছে এবং এটি অন্যদের জন্য একটি অনুকরণীয় মডেল হয়ে উঠেছে।”
বর্তমান উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. হারুন অর রশিদ বলেন, “সাবেক ইউএনও মো. আরিফুল ইসলাম স্যারের উদ্যোগকে আমরা আরও সম্প্রসারিত করার চেষ্টা করছি। সরকারি দপ্তরের পতিত জমি এভাবে কাজে লাগালে একদিকে যেমন খাদ্য উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে পরিবেশও সুরক্ষিত থাকবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ উপজেলার অন্যান্য সরকারি জমিতেও নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।”
উপজেলা পরিষদ চত্বরে গড়ে ওঠা এই সবজি বাগান দেখতে প্রতিদিনই আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসছেন। অফিস প্রাঙ্গণে এমন উৎপাদনশীল ও পরিবেশবান্ধব কর্মকাণ্ড দেখে স্থানীয়রা অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। অনেকেই নিজ নিজ বাড়ির আঙিনা ও আশপাশের পতিত জমিতে সবজি চাষের পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন।
স্থানীয় সবজি ব্যবসায়ী আ. মজিদ বলেন, “এখানে উৎপাদিত সবজি একদম টাটকা ও বিষমুক্ত। বাজারের তুলনায় মান অনেক ভালো। এমন উদ্যোগ থাকলে স্থানীয়ভাবে নিরাপদ সবজির জোগান বাড়বে।”
অন্য সবজি ব্যবসায়ী সজিব জানান, “উপজেলা চত্বরে সবজি চাষ দেখে আমরাও উৎসাহিত হয়েছি। যদি সরকারি পর্যায়ে আরও এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে কৃষক ও ব্যবসায়ী—দু’পক্ষই লাভবান হবে।”
উপজেলা প্রশাসনের কর্মচারী মো. লিয়াকত আহমেদ বলেন, “গত বছর অল্প পরিসরে সবজি চাষ করে ভালো ফলন পাওয়ার পর বর্তমান ইউএনও স্যারের নির্দেশনায় এবার আরও বড় পরিসরে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষি অফিসের সহযোগিতায় আমরা নিয়মিত পরিচর্যা করছি।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারি দপ্তরের পতিত জমিকে এভাবে কাজে লাগানোর উদ্যোগ সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে একদিকে যেমন খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার হবে, তেমনি মানুষের মধ্যে কৃষি ও পরিবেশ সচেতনতা বাড়বে। প্রশাসনের এমন ইতিবাচক ও অনুকরণীয় উদ্যোগ দেশের সামগ্রিক কৃষি উন্নয়ন ও টেকসই খাদ্য ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন সচেতন মহল।
এসএস/আরএন