শীত এলেই নাটোরের গ্রামীণ জনপদে ফিরে আসে খেজুরের গুড়ের মৌসুম। ভোরের কুয়াশায় ঢাকা মাঠে খেজুরগাছের মাথা বেয়ে ঝরতে থাকে স্বচ্ছ রস—যার প্রতিটি ফোঁটার সঙ্গে মিশে থাকে শ্রম, ধৈর্য ও প্রজন্মের পরম্পরায় লালিত এক ঐতিহ্য। পাটালি গুড়ের সেই মধুর ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে, জুড়ে যায় শীতের পিঠা-পায়েস আর উৎসবের আবহে।
নভেম্বর থেকে জানুয়ারি—এই তিন মাস অন্ধকার ভেঙে মাঠে নামেন গাছিরা। কোমরে দড়ি, হাতে দা আর চোখে অভিজ্ঞতার দৃঢ়তা নিয়ে তারা শীতের কনকনে ঠাণ্ডা উপেক্ষা করে গাছ বেয়ে উঠে রস সংগ্রহ করেন।
গুরুদাসপুরের গাছি রফিকুল ইসলাম বলেন, “ভোরে উঠে গাছ কাটতে হয়, হাত-পা জমে যায়। এরপর সারারাত রস জ্বাল দিয়ে গুড় বানাতে হয়। দাম কিছুটা বাড়লেও শ্রমের তুলনায় লাভ খুব বেশি নয়।”
শীতের দুপুরে বাঁশ বা কাঠের চুলায় রস জ্বালিয়ে তৈরি হয় পাটালি গুড়। ধোঁয়া আর মিষ্টি ঘ্রাণে ভরে ওঠে আঙিনা। নারীরা সেই গুড় দিয়ে পিঠা, পায়েস ও ক্ষীর তৈরি করেন, আর শিশুদের চোখে দেখা যায় আনন্দের ঝিলিক।
উৎপাদন ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, নাটোর জেলায় বর্তমানে প্রায় ৬ লাখ ২৭ হাজার ৭৯০টি খেজুরগাছ রয়েছে। এর মধ্যে শীত মৌসুমে প্রায় ৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬২২টি গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হয়। প্রতি গাছ থেকে গড়ে ১৭৪ কেজি রস এবং তা প্রক্রিয়াজাত করে ১৭.৪ কেজি গুড় উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।
সব মিলিয়ে জেলায় বছরে প্রায় ৯ হাজার ৬২৩ টন খেজুর গুড় উৎপাদিত হয়, যার বাজারমূল্য আনুমানিক ১০৫ কোটি টাকা।
বর্তমানে স্থানীয় বাজারে ঝোলা গুড় কেজিপ্রতি ১৮০–২০০ টাকা এবং পাটালি গুড় ২০০–২২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় গুড় সরবরাহ করা হচ্ছে।
ঢাকার গুড় ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, “ভেজাল গুড়ের ভিড়েও নাটোরের গুড়ের মান ভালো হওয়ায় এর কদর বেশি। প্রতি বছর এখান থেকে পাটালি গুড় কিনে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করি। খরচ বাদে মোটামুটি লাভ থাকে।”
বিদেশেও নাটোরের গুড়
অনলাইন অর্ডার ও হোম ডেলিভারির মাধ্যমে নাটোরের খেজুরের গুড় ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাঙালিদের কাছেও পৌঁছাচ্ছে। অনলাইনভিত্তিক রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তা সেলিম মোল্লা জানান, প্যাকেটজাত করার ফলে বিদেশের বাজারে তুলনামূলক বেশি দামে গুড় বিক্রি সম্ভব হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মত
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর ডিস্টিংগুইশড ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,
“নাটোরের খেজুরের রস ও গুড় শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, এটি গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে পরিচ্ছন্নতা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং গাছিদের প্রশিক্ষণ জরুরি।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হাবিবুল ইসলাম খান জানান, খেজুরগাছ কাটার পদ্ধতি থেকে শুরু করে গুড় তৈরির প্রতিটি ধাপে গাছিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে পণ্যের মান ও আয়ের স্থায়িত্ব নিশ্চিত হয়।
উল্লেখ্য, নাটোর জেলায় প্রায় ১০ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষভাবে খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। ফলে খেজুরের গুড় শুধু ঐতিহ্যের প্রতীক নয়, বরং এ অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতি ও জীবিকার এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
শীতের কুয়াশাঘেরা সকালে খেজুরবাগানে শুধু গাছি নয়, যেন ইতিহাসও হেঁটে চলে। রসের প্রতিটি ফোঁটা জমাট বাঁধে গুড়ে—আর সেই গুড়ের সঙ্গে মিশে থাকে শ্রম, স্মৃতি ও বাংলার শিকড়ের গল্প।
এমএএম/এসআর