সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ‘এশিয়ার নেলসন ম্যান্ডেলা’ হিসেবে অভিহিত করে বিএনপি নেতারা বলেছেন, আপোষহীন রাজনীতির যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, সেই পথ ধরেই দেশ ও দল পরিচালনা করবেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টায় খুলনার ঐতিহাসিক শহীদ হাদিস পার্কে খুলনা মহানগর বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত নাগরিক শোকসভা ও দোয়া মাহফিলে বক্তারা এসব কথা বলেন।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও খুলনা-২ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ৪১ বছরের রাজনৈতিক জীবনে বেগম খালেদা জিয়া একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে আপোষহীন দেশনেত্রীতে পরিণত হয়েছেন। তাঁর সংগ্রাম ও ত্যাগের ইতিহাস বিশ্ব রাজনীতিতে বিরল দৃষ্টান্ত।
তিনি বলেন, দেশের মানুষের ভোটে তিনবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে তিনি দক্ষতার সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। “বেগম খালেদা জিয়ার জীবনকথা শুধু আলোচনার নয়, গবেষণার বিষয়”—উল্লেখ করেন তিনি।
খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত ত্যাগের কথা তুলে ধরে মঞ্জু বলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে তিনি স্বামী ও সন্তান হারিয়েছেন। এক সন্তানকে বিদেশে রেখেও দেশের মানুষের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে তিনি কখনো আপোষ করেননি। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপিকে সংগঠিত করা এবং রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে উত্তরণে তাঁর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক।
সার্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শহীদ জিয়ার প্রতিষ্ঠিত সার্ককে বেগম খালেদা জিয়া অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন জাতীয় ঐক্যের প্রতীক, যিনি সব রাজনৈতিক শক্তিকে এক প্ল্যাটফর্মে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছরের আন্দোলন ও সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশ আজ স্বৈরাচারমুক্ত। তিনি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি দ্রুত একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।
বিএনপি নিয়ে সমালোচকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “বিএনপি মানুষের হাড়-মজ্জায় মিশে আছে। ষড়যন্ত্র করে বিএনপির অগ্রযাত্রা থামানো যাবে না।”
প্রধান বক্তার বক্তব্যে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির তথ্যবিষয়ক সম্পাদক ও খুলনা-৪ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী আজিজুল বারী হেলাল বলেন, বেগম খালেদা জিয়া এখন আর শুধু বিএনপির নন, তিনি পুরো জাতির সম্পদ। দেশের প্রতিটি প্রান্তে তাঁর সুস্থতা কামনায় দোয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ১৯৮১ সালে রাজনীতিতে পদার্পণের পর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়া রাজপথ থেকেই নেতৃত্ব দিয়েছেন। ফিলিপাইনের সাবেক নেত্রী কোরাজন অ্যাকুইনোর সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, জনগণের শক্তিতেই তিনি স্বৈরাচারকে বিদায় নিতে বাধ্য করেছিলেন।
খালেদা জিয়ার শাসনামলের সংস্কারমূলক উদ্যোগ তুলে ধরে হেলাল বলেন, বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, মেয়েদের দশম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা, বিদ্যালয়ে খাবার কর্মসূচি এবং নারী মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি ছিল যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
আগামী দিনের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হবে। পাশাপাশি ৫০ লাখ পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার মাধ্যমে নারীদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং উন্নত চিকিৎসার ব্যয়ভার রাষ্ট্র বহনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনা বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন মানেই গণতন্ত্রের জন্য আপোষহীন লড়াই। দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তিনি কখনো আপোষ করেননি—বিদেশের মাটিতেও নয়।
তিনি বলেন, দেশনায়ক তারেক রহমান বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রতীক। বেগম খালেদা জিয়া যে পথ দেখিয়ে গেছেন, সেই পথেই তিনি দল ও রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন।
সভায় আরও বক্তব্য দেন খুলনা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা মনিরুজ্জামান মনি, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান মন্টু, ড্যাব সভাপতি ডা. রফিকুল ইসলাম বাবলু, খুলনা মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি রাশেদুল ইসলাম, খুলনা প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক এনামুল হকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, পেশাজীবী ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
শোকসভা শেষে বেগম খালেদা জিয়া ও প্রয়াত নেতাকর্মীদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
এসএমএস/এসআর