Monday | 1 June 2026 | Reg No- 06
Epaper | English
   
English | Monday | 1 June 2026 | Epaper
BREAKING: সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে মার্কেট-শপিংমল বন্ধের নির্দেশ      প্রবীণ আ.লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ মারা গেছেন      পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ      ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে গ্রাহক-পুলিশ সংঘর্ষ      ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি যুক্তরাষ্ট্রের      মরণোত্তর জাতিসংঘ পদক পাচ্ছেন ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী      বাজেটের আগে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি এক ধরনের ধোঁকাবাজি: জামায়াত আমির      

মিয়ানমারের আভ্যন্তরীন সংঘাত: জাতীয় নিরাপত্তায় কতটুকু হুমকি?

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯:০১ পিএম   (ভিজিট : ৩১৬)

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতিতে ‘সার্বভৌমত্ব’ শব্দটি কেবল মানচিত্রের সীমানা রক্ষা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, সার্বভৌমত্ব হলো একটি রাষ্ট্রের তার ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা এবং নাগরিকদের জানমালের নিরঙ্কুশ নিরাপত্তা প্রদানের সক্ষমতা।

কিন্তু বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে গত কয়েক দশকে, বিশেষ করে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত যা ঘটছে, তা আমাদের সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞাকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ৯ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে মিয়ানমারের রাখাইন (সাবেক আরাকান) রাজ্যে যে নতুন মাত্রার সংঘাত শুরু হয়েছে, তা কেবল প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা নয়, বরং বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জননিরাপত্তার ওপর এক সুদূরপ্রসারী আঘাত।

রাখাইন রাজ্য, যা ঐতিহাসিকভাবে আরাকান নামে পরিচিত, তা সবসময়ই মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য একটি মাথাব্যথার কারণ ছিল। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এবং বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত অবস্থানে থাকা এই অঞ্চলটি এখন কেবল জান্তা বনাম আরাকান আর্মির লড়াইয়ের ময়দান নয়, বরং এটি এখন বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের কেন্দ্রবিন্দু।

বিগত দুই বছর ধরে বিদ্রোহী আরাকান আর্মি (এএ) রাখাইনের একের পর এক শহর জান্তা সরকারের আয়ত্ব থেকে দখল করে নিয়েছে। মিয়ানমার জান্তা সরকার জাতিগত নির্মূলের উন্মাদনায় রোহিঙ্গাদের অত্যাচার নির্যাতনের মধ্যদিয়ে দেশান্তরি করে কার্যত রাখাইন অঞ্চলে নিজেদের নিরাপত্তার ভারসাম্য চিরতরে নষ্ট করেছে। এক সময়ের শক্তিশালী এই জনপদ থেকে রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দেওয়ার ফলে যে জনশূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহী ‘আরাকান আর্মি’র (এএ) জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়। স্থানীয় পর্যায়ের কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রতিরোধ না থাকায় বিদ্রোহীরা অতি দ্রুত তাদের আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ পায়। রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করার মধ্য দিয়ে তারা আসলে আরাকান আর্মিকে একটি উন্মুক্ত যুদ্ধক্ষেত্র উপহার দিয়েছে সেটি জান্তা বাহিনী এখন উপলব্ধি করছে কিনা জানি না। তবে এর ফলশ্রুতিতে আজ রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ জান্তার হাত থেকে কার্যত ফসকে গেছে। এই কৌশলগত আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের কারণেই আজ রাখাইন মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথে।

২০২৪ সালে উভয়পক্ষের যুদ্ধের মাঝে ফেব্রুয়ারিতে যখন মিয়ানমার মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং সীমান্তরক্ষি বাহিনী-বিজিপি’র ৩৩০ জন সদস্য বাংলাদেশে পালিয়ে আসে, তখনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে জান্তা বাহিনী সেখানে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে। কিন্তু ৯ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে। এবারের লড়াই আর কেবল জান্তা বনাম বিদ্রোহী নয়। এবারের লড়াই হচ্ছে ‘এলাকা দখলের লড়াই’।

আরাকান আর্মি এখন রাখাইনের অঘোষিত শাসক। তারাও জান্তা সরকারের মত রোহিঙ্গাদের প্রতি বিরোপ মনোভাব পোষণ করছে। কিন্তু রোহিঙ্গারা নিজ ভূমিতে ফেরার তাগিদে বিদ্রোহী আরাকান আর্মির এই একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে কয়েকটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী—যেমন রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন-আরএসও, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি-আরসা এবং আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি-এআরএ।

বিভিন্ন মাধ্যমে যেটি জানা যাচ্ছে- তাতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মিয়ানমার জান্তা বাহিনী নিজেদের পরাজয় ঠেকাতে এখন ‘বিভাজন ও শাসন’ নীতি গ্রহণ করেছে। তারা রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দিচ্ছে এবং আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে রাখাইন এখন এক চতুর্মুখী লড়াইয়ের ক্ষেত্র, যার বুলেটের শব্দ প্রতিদিন বাংলাদেশের সীমান্তবতী মানুষের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে।

প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক করুণ চিত্র—সীমান্তের ল্যান্ডমাইন। মিয়ানমার জান্তা বাহিনী এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন তোয়াক্কা না করে জিরো লাইনে ল্যান্ডমাইন পুঁতে রেখেছে। এর শিকার হচ্ছে আমাদের নিরীহ কৃষক ও শ্রমিকরা। যেমন সোমবার (১২ জানুয়ারি ২০২৬) সকালে টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তের লম্বাবিলে নিজ চিংড়িঘেরে কাজ করার সময় মাইন বিস্ফোরণে মো. হানিফ (২৮) নামের এক বাংলাদেশি যুবক তার বাম পা হারিয়েছেন। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি সীমান্তবতী মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে এবং নাফ নদীতে জেলেদের জীবনজীবিকা বন্ধ করে দিয়েছে। এটি আমাদের সার্বভৌম সীমানার ভেতরে নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তাহীনতার এক জ্বলন্ত প্রমাণ।

এছাড়া ৯ জানুয়ারির পর থেকে টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্তে যেভাবে ওপার থেকে আসা গুলিতে আমাদের শিশুদের বিদ্ধ করা হচ্ছে, তা সরাসরি সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন। মিয়ানমার থেকে আসা বুলেটের আঘাতে টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তে ১২ বছরের শিশু আফনান আরার জীবন এখন সংকটাপন্ন। রোববার (১১ জানুয়ারি) সকালে নিজ বাড়ির আঙিনায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিনের মতে, শিশুটির মাথায় বিদ্ধ হওয়া গুলিটি এমন এক স্পর্শকাতর জায়গায় রয়েছে যে তা বের করতে গেলে রক্তক্ষরণে মৃত্যুর ঝুঁকি রয়েছে। নিজ দেশে, নিজ বাড়িতে থেকেও সীমানার ওপার থেকে আসা লক্ষ্যহীন বুলেটে একটি শিশুর এমন জীবন-মরণ লড়াই আমাদের সীমান্ত নিরাপত্তার শিথিলতা এবং সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাতের এক প্রতিচ্ছবি।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর তথ্যমতে, এ সপ্তাহেও মিয়ানমারের নাগরিক ৪৯ জন সশস্ত্র সদস্য বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। এই অনুপ্রবেশকারীরা যখন আমাদের সীমানাকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করে, তখন আমাদের আন্তর্জাতিক ইমেজ ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা—উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়ে।

এদিকে রাখাইন রাজ্যের বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে শক্তিশালী পক্ষ হলো আরাকান আর্মি। বৌদ্ধ জাতিগত পরিচয়ে ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বাহিনীটি আজ মিয়ানমারের জান্তা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। তাদের লক্ষ্য হলো ‘আরাকান ড্রিম’ বাস্তবায়ন করা, যার অর্থ রাখাইন রাজ্যের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতা। বর্তমানে রাখাইনের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু বর্তমানে যে প্রতিরোধের মুখে পড়ছে, তা তাদের জন্য অভূতপূর্ব। আগে লড়াই ছিল কেবল জান্তা বাহিনীর সাথে, এখন লড়াই হচ্ছে ওইসব গোষ্ঠীর সাথে যারা নিজেদের এলাকায় প্রভাব ধরে রাখতে চায়।

রাখাইন রাজ্যে এখন কেবল আরাকান আর্মিই একমাত্র পক্ষ নয়। আরএসও, আরসা এবং এআরএ-এর মতো গোষ্ঠীগুলো নতুন করে সংগঠিত হয়েছে। বর্তমান যে সংঘাত আমরা দেখছি, তা মূলত কৌশলগত এলাকা দখলের লড়াই। বিশেষ করে নাফ নদীর তীরবর্তী এবং বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাগুলোতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে মরিয়া এই গোষ্ঠীগুলো।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মিয়ানমার জান্তা বাহিনী এখানে একটি ‘প্রক্সি গেম’ খেলছে। জান্তা বাহিনী রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে দিচ্ছে। তারা কিছু রোহিঙ্গাকে বলপ্রয়োগ করে সেনাবাহিনীতে নিচ্ছে, আর কিছু গোষ্ঠীকে পরোক্ষ মদদ দিচ্ছে আরাকান আর্মিকে ব্যস্ত রাখতে। এই বহুমুখী সংঘাতের ফলে উদ্ভূত অরাজকতা সরাসরি আমাদের সীমান্তে আছড়ে পড়ছে।

কয়েক বছর সীমান্তের ওপারে যে অবিরাম গোলাগুলি চলছে, তা সরাসরি বাংলাদেশের নাগরিকদের জীবনকে বিষিয়ে তুলছে। এই ৯ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই দফার সংঘাত কেবল মিয়ানমারের গহিন অরণ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা এখন আমাদের জিরো লাইনের খুব কাছে চলে এসেছে।

টেকনাফে শিশুটি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়। যখন কোনো দেশের সীমানার ভেতরে অন্য দেশের বুলেট এসে পড়ে, তখন সেটি আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় ‘সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন’ (Violation of Sovereignty)। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আমাদের নাগরিকরা নিজেদের ভিটেমাটিতে নিরাপদ নয়। এটি আমাদের রাষ্ট্রের নাগরিকদের জীবন রক্ষার সাংবিধানিক অঙ্গীকারের ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন।

৯ জানুয়ারির পর থেকে যে ৪৯ জন বা তার বেশি সশস্ত্র সদস্যের অনুপ্রবেশ ঘটেছে, তাদের পরিচয় এখনো ধোঁয়াশায়। তারা যদি কোনো রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্য না হয়ে কেবল বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্য হয়, তবে তাদের অনুপ্রবেশকে ‘সশস্ত্র আগ্রাসন’ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, বাংলাদেশ এই ইস্যুতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে (UNSC) জরুরি আলোচনার দাবি তুলতে পারে।

এই নতুন দফার লড়াইয়ের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো মিয়ানমার জান্তা বাহিনীর দ্বিমুখী আচরণ। একসময় যারা রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিল, সেই জান্তাই এখন রোহিঙ্গাদের একাংশকে (যেমন আরসা বা আরএসও-র কিছু অংশ) পরোক্ষ সমর্থন দিচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এর মূল লক্ষ্য হলো আরাকান আর্মিকে (AA) সীমান্তে ব্যস্ত রাখা এবং রোহিঙ্গাদের সাথে আরাকান আর্মির একটি স্থায়ী জাতিগত দাঙ্গা বাঁধিয়ে দেওয়া।

বিষয়টি রাখাইনের পরিস্থিতি শান্ত না হওয়ার পেছনে চীনের কৌশলগত স্বার্থ কাজ করছে। চীনের তেল ও গ্যাস পাইপলাইন রাখাইনের ভেতর দিয়ে ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। চীন চায় রাখাইনে এমন একটি শক্তি ক্ষমতায় থাকুক যারা তাদের বিনিয়োগের সুরক্ষা দেবে। ৯ জানুয়ারি থেকে চলা এই এলাকা দখলের লড়াইয়ে চীন সম্ভবত দুই পক্ষকেই (জান্তা ও আরাকান আর্মি) নিজেদের পক্ষে রাখার চেষ্টা করছে, যা বাংলাদেশের জন্য এই সংকট মেটানো আরও কঠিন করে দিচ্ছে।

অপরদিকে ভারত তাদের মিজোরামের সাথে সংযুক্তির জন্য রাখাইনের সিতওয়ে বন্দর ও কালাদান নদীর রুটটি ব্যবহার করতে চায়। ফলে ভারতও রাখাইনে স্থিতিশীলতা চায়, কিন্তু তারা জান্তা সরকারের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখছে। এই ত্রিদেশীয় স্বার্থের লড়াইয়ের মাঝে বাংলাদেশ কার্যত একা হয়ে পড়ছে, যার মাশুল দিচ্ছে আমাদের সীমান্তবতী নাগরিকরা।

মিয়ানমার থেকে নতুন করে ৪৯ জন সশস্ত্র সদস্যের অনুপ্রবেশ আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চরম হুঁশিয়ারি। এখন আর কেবল ‘মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি’ নয়, সীমান্তে প্রয়োজন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কঠোর প্রয়োগ। বিজিবি-কে প্রথাগত পাহারার গণ্ডি পেরিয়ে জিরো লাইনে ড্রোন ও সেন্সর প্রযুক্তিনির্ভর একটি ‘ডিজিটাল বাফার জোন’ গড়ে তুলতে হবে।

২০২৪ সালে পালিয়ে আসা ৩৩০ জন সেনাসদস্য আর ২০২৬-এর এই ৪৯ জন সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারীর মধ্যে বড় তফাৎ হলো তাদের রাজনৈতিক বৈধতা। এদের পরিচয় নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আওতায় জেরা করা এবং কোনো নিষিদ্ধ গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। রাখাইন যদি পুরোপুরি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়, তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আগামী এক দশকের জন্য অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। ওপার থেকে আসা গুলিতে এপারে আমাদের শিশু বিদ্ধ হওয়া প্রমাণ করে যে, এখন সময় এসেছে আমাদের সামরিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতার একটি দৃশ্যমান বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর। কারণ, "ক্ষমতা ও শক্তি থাকলে আইন মানার দরকার নেই"—মিয়ানমারের এই নীতি বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল হুমকি।

ভেনিজুয়েলার প্রসঙ্গ যে প্রশ্নটি আলোচিত হচ্ছে—"শক্তি থাকলে কি আইন মানার দরকার নেই?"—সেই একই প্রশ্ন আজ মিয়ানমার সীমান্ত নিয়ে প্রাসঙ্গিক। ইউক্রেনের সীমানা রক্ষায় বিশ্ব মোড়লরা যতটা আগ্রহী, বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকের ওপর মিয়ানমারের এই ‘সীমানা-সন্ত্রাস’ নিয়ে তারা ততটাই নিশ্চুপ।

বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে এটি স্পষ্ট করতে হবে যে, মিয়ানমারের এই অভ্যন্তরীণ সংঘাত এখন কেবল তাদের নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য একটি আঞ্চলিক হুমকি। চীন ও ভারতের মতো বড় শক্তিগুলোকে তাদের কৌশলগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের গ্যারান্টি দিতে হবে। নয়তো এই অঞ্চলে যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে, তার আঁচ থেকে কেউ রক্ষা পাবে না।

ইতিহাস সাক্ষী দেয়, কেবল আধুনিক মারণাস্ত্র দিয়ে একটি দেশ বা সীমান্তকে রক্ষা করা যায় না। তার জন্য প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য এবং রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছে যে, বন্দুকের শক্তির চেয়ে মানুষের আত্মমর্যাদা ও নৈতিক ঐক্য অনেক বেশি শক্তিশালী।

মিয়ানমার সীমান্ত সংকট আজ আমাদের জাতীয় ঐক্যের এক অগ্নিপরীক্ষা। রাখাইনে ৯ জানুয়ারি থেকে যে এলাকা দখলের লড়াই চলছে, তাকে পুঁজি করে কোনো পক্ষ যাতে আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি নষ্ট করতে না পারে, সেদিকে সজাগ থাকতে হবে।

পরিশেষে, সার্বভৌমত্ব কেবল মানচিত্রে অঙ্কিত একটি রেখা নয়; এটি একটি জীবন্ত প্রতিশ্রুতি যা রাষ্ট্র তার নাগরিকদের দেয়। টেকনাফে গুলিবিদ্ধ শিশুটি বা মাইনে পা হারানো সেই অসহায় নাগরিকটি আমাদের রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বেরই প্রতিচ্ছবি। মিয়ানমার সীমান্ত সংকট আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একবিংশ শতাব্দীতে টিকে থাকতে হলে আমাদের দরকার অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, কৌশলী কূটনীতি এবং সর্বপরি একটি অবিচল নৈতিক অবস্থান।

ইতিহাসের আদালতে মিয়ানমারের এই আগ্রাসী ও আধিপত্যবাদী আচরণের বিচার একদিন হবেই। তবে তার আগে আমাদের নিজেদের ঘর সামলাতে হবে। বাংলাদেশের প্রতিটি ইঞ্চি মাটি এবং প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হোক আমাদের সার্বভৌমত্বের আসল বিজয়।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
farukkht@yahoo.com




LATEST NEWS
MOST READ
আরও পড়ুন
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000.
Phone: PABX- 41053001-06; Online: 41053014; Advertisement: 41053012.
E-mail: district@dailyobserverbd.com, news©dailyobserverbd.com, advertisement©dailyobserverbd.com, For Online Edition: mailobserverbd©gmail.com
🔝
close