ভোলার চরফ্যাশনের সর্বদক্ষিণের জনপদ ঢালচর নদীভাঙনে ক্রমেই ছোট হয়ে এলেও এর পশ্চিম ও দক্ষিণে পড়ে আছে প্রায় দুই হাজার একর পতিত খাসজমি। বলা যায়, ভাঙনের বিপরীতে এখানে রয়েছে বিপুল সম্ভাবনার হাতছানি। দ্বীপের মানুষ এই জমিতে অধিকার চান। তারা এখানে বসতি গড়ে তুলতে এবং পরিকল্পিতভাবে ঘরবাড়ি নির্মাণ করতে আগ্রহী। কিন্তু আইনগত জটিলতা তাদের এই দাবির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঢালচর ইউনিয়ন পরিষদ সূত্র জানায়, চরের পশ্চিম, দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে বিপুল পরিমাণ খাসজমি পড়ে আছে, যার পরিমাণ আনুমানিক দুই হাজার একর। এসব জমিতে উল্লেখযোগ্য গাছপালা নেই। কিছু এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ছড়ানো-ছিটানো গাছ দেখা যায়। ৪০ বছরেরও বেশি পুরোনো এই চরটির জমি বেশ উর্বর। এখানে চাষাবাদ সম্ভব এবং নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া অন্তত ১২–১৩শ’ পরিবার পুনর্বাসিত হতে পারে।
ঢালচরের পশ্চিমে আনন্দবাজার-সংলগ্ন বনাঞ্চলে বর্তমানে গাছপালা প্রায় নেই বললেই চলে। প্রকৃতি যেন সবুজ ঘাসের গালিচা বিছিয়ে রেখেছে এই চরে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গরু-মহিষের বিচরণ চোখে পড়ে। তবে গাছপালার সংখ্যা একেবারেই কম। অনেক গাছ মরে যাচ্ছে, আবার কিছু গাছ চুরি হয়ে যাচ্ছে। বনের পাশে রয়েছে চরের সরু খাল। খালের ওপারে আবারও বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল। এই বনের গা ঘেঁষেও রয়েছে বিশাল খাসজমি, যেখানে কোনো গাছপালা নেই।
চরের বালু দেখে বোঝা যায়, এখানে বর্তমানে সমুদ্র বা নদীর পানি ওঠে না। বালু শুকিয়ে গেছে এবং তার ওপর জন্মেছে সবুজ ঘাস। ছড়ানো-ছিটানো কিছু কুলগাছ দেখা যায়, যা সম্ভবত সমুদ্রের পানিতে ভেসে আসা বীজ থেকে জন্ম নিয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের এই চরের পাশে বন বিভাগের একটি বড় এলাকা রয়েছে। বনের ভেতরের খালে এখন আর জোয়ারের পানি প্রবেশ না করায় সেখানে কেওড়া গাছের শ্বাসমূল মরে যাচ্ছে।
পতিত খাসজমিতে নিঃস্ব মানুষের পুনর্বাসন প্রসঙ্গে কথা হয় কাঞ্চন মুন্সি নামের এক বাসিন্দার সঙ্গে। তিনি চরফ্যাশন উপজেলার বিচ্ছিন্ন সাগর মোহনার ঢালচর ইউনিয়নের ভদ্রপাড়া এলাকায় মেঘনা নদীর তীরে বসবাস করেন। বাঁশের কঞ্চি ও ত্রিপল দিয়ে তৈরি একটি ঝুপড়ি ঘরে তিনি স্ত্রী, তিন সন্তান, এক পুত্রবধূ ও নাতিকে নিয়ে থাকছেন।
কাঞ্চন মুন্সি জানান, একসময় তার ভালো বসতঘর ও ফসলি জমি ছিল। কিন্তু মেঘনা নদীর ভাঙনে সবকিছু হারিয়েছেন। এ পর্যন্ত চারবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে তিনি নিঃস্ব হয়েছেন। মাত্র ১০ দিন আগে সন্তানদের নিয়ে নদীর পাশে এই অস্থায়ী আশ্রয়টি নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন। নদীভাঙনের কারণে তিনি ঋণে জর্জরিত। বর্তমানে দুই সন্তানকে নিয়ে সাগর মোহনার মেঘনা নদীতে মাছ শিকার করে কোনোমতে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
তিনি আরও বলেন, “আমার কোনো জমিজমা বা টাকা নাই। তাই বাধ্য হইয়া বনের বাঁশ কেটে আর ত্রিপল দিয়ে কোনো রকম তাঁবুর মতো ঘর বানাইয়া থাকতেছি। প্রচণ্ড শীতে মাটিতে ঘুমাইতে হয়। এখন যেই জায়গায় আছি, এইডাও পরের জমি। উঠাইয়া দিলে কোথায় যামু জানি না। সরকার যদি একটু জমি দিত, তাইলে ধার-দেনা কইরা হলেও ঘর তুলতে পারতাম।”
তার স্ত্রী আয়েশা বেগম বলেন, নদী আমাদের জমি-ঘর সব নিয়ে যাওয়ার পর কয়েকবার ঋণ করে অন্য জায়গায় ঘর তুলেছিলাম, তাও নদীতে চলে গেছে। এখন আমরা পুরোপুরি নিঃস্ব।
কাঞ্চন মুন্সির পুত্রবধূ শিরিনা বেগম বলেন, “ভালো ঘরবাড়ি ও জমিজমা দেখেই আমার বিয়ে হয়েছিল। এখন সব নদীতে নিয়ে গেছে। আমরা এখন নদীর পাড়ে ত্রিপলের তাঁবুর মতো ঘরে থাকি। শীতের মধ্যে মাটিতে ঘুমাতে হয়। ছোট অবুঝ শিশুকে নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটে।”
অন্যদিকে, সব হারিয়ে ঢালচর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের শান্তিনগর এলাকায় বন বিভাগের বাগানে ঝুঁকি নিয়ে স্ত্রী ও সন্তানসহ বসবাস করছেন জেলে মো. হুমায়ুন কবীর। তিনি জানান, এ পর্যন্ত ৮–১০ বার মেঘনা নদীর ভাঙনের কবলে পড়েছেন। বাবা-দাদার জমি, বসতঘর এবং নিজের জমানো টাকা সবই নদীতে হারিয়েছেন। জমি কেনার সামর্থ্য না থাকায় বন বিভাগের বাগানের এক ফাঁকে টিন, বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে ঝুপড়ি ঘর তুলে বসবাস করছেন।
তিনি বলেন, শীতে প্রচণ্ড কষ্ট হয়। বৃষ্টি ও ঝড়ের সময় ঘরে পানি ঢুকে সব ভিজে যায়। বন বিভাগের বাগানে থাকার কারণে রাতে সাপ ও বন্যপ্রাণীর আতঙ্ক থাকে। এ ছাড়া বন বিভাগ প্রায়ই সেখান থেকে সরে যেতে বলে। অথচ ঢালচর ইউনিয়নে সরকারি খাসজমি থাকলেও আজ পর্যন্ত কাউকে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়নি। ফলে জমিগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে, আর আমরা ভূমিহীন মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছি।
তার ভাষায়, “সরকারের কাছে আমাদের আকুল আবেদন এই সরকারি জমি আমাদের বন্দোবস্ত দেওয়া হোক।”
ঢালচর ইউনিয়নে বর্তমানে প্রায় ১২ হাজার মানুষের বসবাস, যার মধ্যে অধিকাংশই ভূমিহীন। তারা বর্তমান সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছেন ঢালচরের ভূমিহীন মানুষের মানবেতর জীবন থেকে মুক্তির জন্য সরকারি খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়ার।
এ বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লোকমান হোসেন জানান, ঢালচরের ভূমিহীন মানুষ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী খাসজমি পাওয়ার জন্য আবেদন করলে তা যাচাই-বাছাই করা হবে। যাচাইয়ে যারা যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন, তাদের মধ্যে খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়া হবে।
এসএফ/আরএন