উত্তরাঞ্চলের সমতলের চা ভূস্বর্গ পঞ্চগড়। শীতের দুই মাস চা বাগান পরিচর্যা সরকারি ভাবে ০৩ জানুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উত্তরাঞ্চলের চা কারখানাগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
ফলে টানা দুই মাস চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলো বন্ধ থাকবে। এ সময়ের মধ্যে চাষিরা টেকসই চা উৎপাদন ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে বাগান পরিচর্যা ও প্রুনিংসহ যাবতীয় কাজ শুরু করে দিয়েছে তারা।
চা বোর্ড জানিয়েছে, বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সুপারিশ অনুযায়ী, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি দুই মাস চা বাগানে পরিচর্যা ও প্রুনিং করতে হয়। টেকসই চা উৎপাদন ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের চা কারখানাগুলোতে কাঁচা পাতা সরবরাহ ও চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ক্ষুদ্র চা-চাষিদের কাছ থেকে সবুজ চা-পাতা ক্রয় করা হবে। ০২ জানুয়ারি সবুজ চা-পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণ শেষ করতে হবে। ১৫ জানুয়ারির মধ্যে কারখানার উৎপাদিত চায়ের শ্যাকিং ও প্যাকিং শেষে নিলামে পাঠানোর জন্য স্টোরেজ করার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ০১ মার্চ থেকে পুনরায় বটলিফ চা কারখানাগুলোতে উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রম শুরু করা যাবে।
জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গেল মৌসুমে চা পাতার দাম ভালো পাওয়ায় লাভবান হয়েছেন চাষিরা। নতুন মৌসুমে বাগানে নতুন পাতা উৎপাদনে চা বাগানে চলছে ছাটাই বা প্রুনিংয়ের কাজ। নতুন মৌসুমে নতুন পাতা উৎপাদনে দাম পাওয়ার আশা করছেন চাষিরা। ফলে বাগানে শ্রমিক নিয়ে করছেন বাগান ছাটাইয়ের কাজ। বাগানের গাছগুলোর মাথা একটি নির্দিষ্ট মাপে ছেঁটে ফেলছেন তারা।
সমতলের চা বাগান ঘিরে তৈরি হয়েছে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান। বছরজুড়েই চা বাগানে থাকে কাজ। শ্রমিকরা বলছেন, কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বাগান থেকে চা পাতা উত্তোলন বন্ধ। এখন চলছে ছাটাইয়ের কাজ। আমরা চুক্তিতে বাগানে ছাটাইয়ের কাজ করছি।
জানা যায়, শীতকালে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় চা বাগানের উৎপাদন প্রক্রিয়া বন্ধ থাকে। এ সময়টিতে প্রকৃতির নিয়মে চা গাছের শাখায় শাখায় শুভ্র ফুল আসে। গাছে ফুল আসা আর গাছের পাতাগুলো ধূসর হয়ে যাওয়ায় চা উৎপাদনের অনুপযুক্ত হয়ে উঠে। ফলে কমে যায় চা পাতার উৎপাদন। পরবর্তী সিজনে ভালোমানের পাতা উৎপাদনের জন্য এ সময় চা গাছগুলো ছেঁটে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বৃষ্টি শুরু হলে এসব নতুন চা পাতা ও কুঁড়ি থেকে উৎপাদন হয় উন্নতমানের চা। দুটি পাতায় একটি কুঁড়ি থেকে সবচেয়ে ভালো মানের চা উৎপাদন হয়।
সমতল চা অঞ্চল হিসেবে ২০০০ সালে বাণিজ্যিক ভাবে চালু হওয়া চা উৎপাদনে সিলেটের পর দ্বিতীয় অঞ্চল হয়ে উঠেছে এ জেলা। প্রায় ১০ হাজার একর জমিতে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় প্রায় সাড়ে ৭ হাজার চা বাগান। নিবন্ধিত ক্ষুদ্র চা বাগান রয়েছে ১ হাজার ১৬৮টি। অনিবন্ধিত চা বাগান রয়েছে ৬ হাজার। নিবন্ধিত ৮৯১ জন এবং অনিবন্ধিত ৫ হাজার ১৮ জন ক্ষুদ্র চা চাষি রয়েছেন। ২০ একরের ওপরে ১৯টি এস্টেট রয়েছে।
বর্তমানে জেলায় ২৩টি চা প্রক্রিয়াজাত কারখানা চালু রয়েছে। এসব কারখানা থেকে গত বছর ১ কোটি ৫২ লাখ কেজি চা উৎপাদন হয়েছে। এছাড়াও ২০২১ সালে ১ কোটি ৪৫ লাখ, ২০২০ সালে ১ কোটি ৩ লাখ ও ২০১৯ সালে ৯৫ লাখ ৯৯ হাজার কেজি চা উৎপাদন হয়েছে। উত্তরাঞ্চলে চা বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত চা কারখানা ৫৮টি। তার মধ্যে চলমান ২৮টি কারখানা। এর মধ্যে ২৩ কারখানায় চা প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে।
সমতলের চা বাগান ঘিরে বেকার নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। জেলার লক্ষাধিক মানুষ জড়িয়ে পড়েছেন চা শিল্পে। বেকারদের একটি বড় অংশ চাকরি ছেড়ে দিয়ে চা চাষে বিনিয়োগ করছেন। এতে করে হাজার হাজার নারী-পুরুষের কাজের কর্মসংস্থান হয়েছে। অর্থনীতিতেও স্বাবলম্বী হয়েছেন তারা। চা অর্থকরী ফসল হিসেবে বছরের নয় মাস চলে বাগানের বিভিন্ন কাজ।
বাগানের পরিচর্যা হিসেবে ফ্লাইং কাটিং অর্থাৎ গাছের মাথা ফ্লাইং কাটিং, সার ও কীটনাশক স্প্রে, পানি নিষ্কাশনের কাজ করা হয়। তিন মাস বাগান পরিচর্যার পর নতুন কুঁড়ি গজে উঠে। এর মাসখানেকের মধ্যেই শুরু হয় পাতা তোলা। শ্রমিকরা বাগানে বাগানে দল বেঁধে কেজিতে ৩ থেকে ৪ টাকা চুক্তিতে পাতা তুলেন। দিন শেষে শ্রমিকদের হাতে আসে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকার মতো। পাতার দাম বাড়লে শ্রমের দামও বেড়ে যায়। এছাড়াও কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে চা কারখানাগুলোতেও। অর্থনৈতিক সচ্ছলতায় বদলে গেছে আর্থসামাজিক অবস্থা। ছনের ছাউনির জায়গায় ইট-কংক্রিটের ঘর-বাড়ি। আধুনিকতার শহরের আদলে গড়ে উঠছে চা গ্রাম।
করতোয়া চা কারখানার ম্যানেজার মঞ্জুরুল আলম বলেন, '০৩ জানুয়ারি থেকে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চা বাগানে পরিচর্যা ও প্রুনিং করতে হয়। টেকসই চা উৎপাদন ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে এ দুই মাস কারখানা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়ার পর আমরা কারখানা বন্ধ রাখছি। এ সময়ের মধ্যে আমরা কোনো কাঁচা পাতা ক্রয় করতে পারবো না। কারখানা বন্ধ রাখায় আমাদের অভ্যন্তরীণ কাজ হিসেবে কারখানার মেশিন খুলে রাখা হবে। আগামী মার্চ থেকে পাতা ক্রয় শুরু হবে।'
বাংলাদেশ চা বোর্ড পঞ্চগড়ের চা শিল্পকে আরও গতিশীল করার জন্য টি সফট মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ও অ্যাপ তৈরি করেছে। যার মাধ্যমে কৃষক থেকে শুরু করে চায়ের অকশনের বায়ার পর্যন্ত চায়ের পরিসংখ্যান সফটওয়ারের মাধ্যমে করা হয়।
এসকে/এমএ