ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
সুনামগঞ্জ-১: হাওরের ভোটের হিসাব-সম্পদ, পেশা আর প্রভাবের দোলাচলে
✎ অবজারভার সংবাদদাতা
⏲ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯:৪২ পিএম আপডেট: ০২.০১.২০২৬ ৯:৪৮ পিএম
X

হাওরের বুকজুড়ে ছড়িয়ে থাকা গ্রাম, জলাভূমি আর বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ, এই বাস্তবতার মধ্যেই গড়ে উঠেছে সুনামগঞ্জ-১ সংসদীয় আসনের রাজনীতি। ধর্মপাশা, মধ্যনগর, জামালগঞ্জ ও তাহিরপুর এই চার উপজেলা নিয়ে গঠিত জেলার সবচেয়ে বড় এই আসনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে এখন উত্তপ্ত রাজনৈতিক আবহ।

ধর্মপাশা, মধ্যনগর, জামালগঞ্জ ও তাহিরপুর এই চার উপজেলা নিয়ে গঠিত হাওরবেষ্টিত আসনটিতে মোট ছয়জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে প্রার্থীদের আয়, সম্পদ, পেশা ও দায়-দেনার বিস্তৃত চিত্র, যা ইতোমধ্যেই ভোটারদের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

মনোনয়নপত্র দাখিলকারীদের মধ্যে বিএনপি থেকে দুইজন প্রার্থী থাকলেও, আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে দলীয়ভাবে একজনকে চূড়ান্ত করা হবে। বাকি চারজন বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন।

পেশাগত পরিচয়: ব্যবসায়ী ও কৃষকের আধিক্য
হলফনামা অনুযায়ী, ছয়জন প্রার্থীর মধ্যে চারজনই পেশা হিসেবে ব্যবসা ও কৃষিকে উল্লেখ করেছেন। শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত রয়েছেন দুইজন, এবং একজন প্রার্থী অতীতে ডাক্তার ও শিক্ষকতা পেশায় সম্পৃক্ত ছিলেন। পেশাগত এই বৈচিত্র্য নির্বাচনী মাঠে ভিন্ন ভিন্ন ভোটব্যাংক তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনীতি বিশ্লেষকরা।

বিএনপির আনিসুল হক: বিপুল সম্পদ, বিপুল ঋণ
বিএনপির মনোনীত প্রার্থী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আনিসুল হক পেশায় ব্যবসায়ী। হলফনামা অনুযায়ী, তার প্রধান আয়ের উৎস ব্যবসা, যেখান থেকে বছরে আয় দেখিয়েছেন ১ কোটি ৭২ লাখ টাকার বেশি। এছাড়া বাড়ি ও বাণিজ্যিক স্থাপনা থেকে ভাড়া বাবদও তার আয় ৪৯ হাজার পাঁচশত টাকা।

তার নিজ নামে ও স্ত্রীর নামে থাকা অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদের বর্তমান আনুমানিক মূল্য প্রায় ৬ কোটি টাকার কাছাকাছি। এসব সম্পদের মধ্যে রয়েছে নগদ অর্থ, ব্যাংক আমানত, যানবাহন, স্বর্ণালঙ্কার, কৃষি ও অকৃষি জমি এবং পাকা ভবন। তবে এসব সম্পদের বিপরীতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে তার নামে রয়েছে ২ কোটি ৩০ লাখ টাকার বেশি ঋণ, যা অন্য প্রার্থীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

কামরুজ্জামান কামরুল: জমিতে শক্ত অবস্থান
বিএনপির অপর মনোনীত প্রার্থী কামরুজ্জামান কামরুল পেশায় ব্যবসায়ী ও কৃষক। কৃষি, গরুর খামার, ভাড়া ও ব্যবসা মিলিয়ে তার বার্ষিক আয় ৫ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা। কৃষি জমি হতে তার স্ত্রীর আয় ১৫ লাখ টাকা। তবে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া প্রায় ২০ একর যৌথ কৃষিজমি তার বড় শক্তির জায়গা।

অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ কম হলেও স্ত্রীর নামে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্বর্ণ রয়েছে। স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে তৃণমূল পর্যায়ে তার একটি নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে বলে মনে করছেন দলীয় নেতাকর্মীরা।

শিক্ষক প্রার্থীরা: মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী তোফায়েল আহমদ পেশায় শিক্ষক। শিক্ষকতা থেকে তার স্থায়ী ও নিয়মিত আয় রয়েছে, যা প্রায় ৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা। ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়পত্র এবং স্বল্প পরিমাণ জমি ও ভবন মিলিয়ে তার সম্পদের পরিমাণ মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে।

বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির প্রার্থী মাওলানা মুজাম্মিল হক তালুকদারও শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত। তার সম্পদের বড় অংশ কৃষিজমি ও ব্যাংক আমানত। বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষক প্রার্থীরা সাধারণত সৎ ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির ভোটে সুবিধা পেলেও, আর্থিক সক্ষমতার ঘাটতি প্রচারণায় প্রভাব ফেলতে পারে।

ইসলামী আন্দোলনের রফিকুল ইসলাম: শিক্ষা ও সম্পদে শীর্ষে
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. রফিকুল ইসলাম চৌধুরী পেশাগত জীবনে চিকিৎসক ও শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি ব্যবসায়ী। হলফনামা অনুযায়ী, তার নিজের ও স্ত্রীর নামে থাকা অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য ১১ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা, যা এই আসনের সব প্রার্থীর মধ্যে সর্বোচ্চ।

তার বার্ষিক আয় প্রায় ৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা এবং স্ত্রীর বার্ষিক আয় ২৮ লাখ ৫৩ হাজার। তার আয়ের বড় উৎস বাসা ও বাণিজ্যিক ভবন থেকে আদায়কৃত ভাড়া। সম্পদের মধ্যে রয়েছে নগদ অর্থ, ব্যাংক আমানত, শেয়ার, একাধিক যানবাহন, বিপুল সঞ্চয়পত্র, অকৃষি জমি ও বহুতল ভবন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষা, পেশাগত অভিজ্ঞতা ও আর্থিক সক্ষমতা এই তিন দিকেই তিনি অন্যদের তুলনায় এগিয়ে রয়েছেন।

উল্লেখ্য, ডা. রফিকুল ইসলাম চৌধুরী ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। সেই সময় তিনি ৯৪ হাজার ৪৯৮ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন।

মুখলেছুর রহমান: সম্পদে সবচেয়ে পিছিয়ে
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুখলেছুর রহমান পেশায় ব্যবসায়ী। তার আয় মূলত ব্যবসা ও ভাড়া নির্ভর। অন্য প্রার্থীদের তুলনায় তার ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ কম। এছাড়া তার ও স্ত্রীর নামে স্বল্প পরিমাণ ঋণ রয়েছে।

ভোটের অঙ্ক
সুনামগঞ্জ-১ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৯০ হাজার ৬২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪৯ হাজার ১৪১ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৪০ হাজার ৯১৫ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ৬ জন। ২৩টি ইউনিয়নে মোট ১৭৭টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

শেষ কথা
প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণে স্পষ্ট—এই আসনে নির্বাচনী লড়াই শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং সম্পদ, পেশা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও সাংগঠনিক শক্তির সমন্বিত প্রতিযোগিতা। শেষ পর্যন্ত ভোটারদের রায়ই নির্ধারণ করবে কে হবেন সুনামগঞ্জ-১ আসনের আগামী সংসদ সদস্য।

একে/আরএন


Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝