রাষ্ট্রীয় অধ্যাদেশ অনুযায়ী শোক দিবস ও সাধারণ ছুটির ঘোষণাকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখালেন খুলনা ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) ঝুমুর বালা। তার অপসারণের দাবিতে আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে খুলনা ওয়াসা ভবনে সকল অফিসিয়াল কাজ বন্ধ রেখে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন খুলনা ওয়াসা কর্মচারী ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ। এ সময় তারা ওই কর্মকর্তার পদত্যাগের দাবিতে সাত দিনের আল্টিমেটাম দেন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কর্মসূচি চলাকালে শ্রমিক ও কর্মচারীরা বিভিন্ন শ্লোগান দেন। এ সময় অধিকাংশ কর্মকর্তাকে অফিসে দেখা যায়নি।
খুলনা ওয়াসা কর্মচারী ইউনিয়ন ও শ্রমিকরা অভিযোগ করেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সরকার তিনদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছিলেন। এর অংশ হিসেবে গতকাল বুধবার সকল সরকারি, বেসরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু এ আদেশ উপেক্ষা করে খুলনা ওয়াসা ভবন খোলা রাখা হয়।
ওয়াসা কর্মচারী ইউনিয়ন ও শ্রমিকরা আরও অভিযোগ করেন, ওইদিন সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করেন উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ঝুমুর বালা। তিনিসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা সরকারের আদেশ অমান্য করে কালো পতাকা উত্তোলন বা কালো ব্যাজ ধারণ করেননি এবং জাতীয় পতাকা অর্ধনমিতও হয়নি। এ সময় গোপনে নিয়োগ বাণিজ্যের প্রক্রিয়া শুরু করা হয় এবং দুপুরে অফিসে উপস্থিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বিরিয়ানী ভোজের আয়োজন করা হয়। ফলে শ্রমিক-কর্মচারীরা ক্ষুদ্ধ হয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে খুলনা ওয়াসা ভবনে আড়াই হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে দুই প্রকৌশলীর প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব, বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতি, মিটার চুরি, পানির বিল আদায় সংক্রান্ত দুর্নীতি ও অন্যান্য অপকর্মের কারণে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। কর্মকর্তারা একে অপরের আদেশ মানছেন না এবং মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ। এর সুযোগে কর্মচারীরাও বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে সুবিধা নিচ্ছেন। ফলে খুলনা ওয়াসা এখন একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিণত হয়েছে এবং নাগরিক সেবার মান শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
আজ বৃহস্পতিবার সকালে খুলনা ওয়াসা ভবনে গিয়ে দেখা যায়, বুধবারের ঘটনার প্রতিবাদে প্রধান ফটকের সামনে শ্রমিক-কর্মচারীরা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন। সংহতি প্রকাশ করে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা।
খুলনা ওয়াসার সামনে সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ইউনিয়ন সভাপতি কবির হোসেন। বক্তৃতা করেন সাধারণ সম্পাদক জিএম আ. গফ্ফার, সহ সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম, দুলাল উদ্দিন খান, মুকুল হোসেন প্রমুখ।
শ্রমিক-কর্মচারী ফেডারেশনের সদস্য সচিব মুকুল বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ঘোষিত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ও বুধবারের সাধারণ ছুটি উপেক্ষা করে দাপ্তরিক কার্যক্রম চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা চলাকালীন এখানে ভুরি ভোজের আয়োজন করা হয়। এছাড়া এখানে দুর্নীতিবাজদের প্রমোশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং কিছু দোসর ছাত্রলীগের ক্যাডার নিয়োগ পেয়েছে। গতকাল এক সাংবাদিককে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। আগে সাংবাদিকরা তথ্য নিতে গেলে তাদের হেনস্তা করা হয়েছে।
কর্মচারী ইউনিয়নের সহ সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম বলেন, সরকারী আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন খুলনা ওয়াসা উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ঝুমুর বালা। তিনি শোক উপেক্ষা করে অফিস খোলা রেখেছিলেন এবং তার পছন্দের লোকদের নিয়োগ দেওয়ার পায়তারা করেছিলেন। আমরা এ ধরনের কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাই এবং তার অপসারণের দাবি জানাই।
শ্রমিক-কর্মচারীদের বিক্ষোভের খবর পেয়ে অনেক কর্মকর্তা আজ অফিসে যাননি। খুলনা ওয়াসা উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ঝুমুর বালাও অফিসে উপস্থিত ছিলেন না।
সদ্য যোগদানকারী সচিব মাহেরা নাজনীন অফিসে ছিলেন। তিনি জানান, বুধবার তিনি ছুটিতে ছিলেন এবং বিষয়টি জানেন না। তবে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ঢাকায় মিটিংয়ে আছেন। রোববার তিনি অফিসে আসলে বিষয়টি জানানো হবে।
বিক্ষোভ কর্মসূচিতে ১৫ নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি কাজী ইকরাম মিল্টন বলেন, সরকারী আদেশ মানা না করা কর্মকর্তাদের দ্রুত অপসারণ করতে হবে। আমরা ঝুমুর বালার অপসারণ চাই।
খালিশপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. তৌহিদুজ্জামান জানান, বেলা ১১ টার দিকে খবর পেয়ে পুলিশ পাঠানো হয়। পরিস্থিতি খারাপ দেখে তিনিও ঘটনাস্থলে যান। তবে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
ঝুমুর বালা বুধবার বলেছেন, "কিছু পেন্ডিং কাজ ছিল, তাই কাজ করছি।" উচ্চ সাউন্ডে কম্পিউটারে হিন্দি গান শোনা এবং খাবারের বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। সাধারণ ছুটির দিনে জরুরি সেবা ব্যতিরেকে বিপুল জনবল নিয়ে অফিস চালানোর যৌক্তিক কারণ তিনি দিতে পারেননি।
কর্মচারী ইউনিয়নের দাবি ও আল্টিমেটাম: ওয়াসা কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি কবির হোসেন বিক্ষোভ চলাকালে আল্টিমেটাম দেন। তাদের দাবি: সরকারী আদেশ অমান্য করে কালো পতাকা উত্তোলন ও কালো ব্যাজ ধারণ না করা, জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত না করা, গোপনে অফিস চালু রেখে নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ডিএমডি ঝুমুর বালাকে ৭ কার্যদিবসের মধ্যে অপসারণ করা। রাষ্ট্রীয় শোক দিবসে বিরিয়ানী খাওয়া ও প্রীতিভোজের আয়োজনের সঙ্গে জড়িতদের অপসারণ। ঢাকা ও চট্টগ্রাম ওয়াসার মতো মাস ভিত্তিক বেতন প্রদান। ৫১, ৫২, ৫৩ ও ৭২তম বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খুলনা ওয়াসার অবশিষ্ট অস্থায়ী কর্মচারীদের স্থায়ী নিয়োগ। ২০২০ সালের ১২ অক্টোবরের অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী বকেয়া বেতন ১০০ টাকা দৈনিক হারে ১৭ মাস ও ১১ মাসের সমুদয় পরিশোধ। সম্প্রতি ৭ জন নিয়মিত দক্ষ শ্রমিককে বিনা নোটিশে ২৬/২ খ আইন লঙ্ঘন করে বরখাস্ত করা হয়েছে; তা দ্রুত প্রত্যাহার করা।
এসএস/আরএন