গ্রামীণ জীবনে খুবই পরিচিত বিষয় বাড়ির উঠোনে শাকসবজি ও ফলের গাছ লাগানো। এক সময় তা বাড়তে বাড়তে টিনের চালেও উঠে যায়। শহরে যাদের বাড়িতে উঠান আছে তারাও বাড়ির আঙিনায় সবজি কিংবা ফলের গাছ লাগান। তবে সেই জায়গা এখন দখল করে নিচ্ছে টব-কৃষি। তবে এই প্রবণতা গ্রামীণ কৃষকদের তুলনায় শহুরে নাগরিকদের মধ্যেই বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে।
টবে ফুলের গাছ লাগানোর পাশাপাশি শহুরের বাসিন্দারা টবে শাকসবজি ও ফলের গাছও লাগাচ্ছেন। যা ছাদ কৃষি নামে ইতোমধ্যে পরিচিতি পেয়েছে। এর পাশাপাশি টিনের চালের বাড়ি যাদের আছে তারাও টিনের চালে টবে শাকসবজির চাষাবাদ করছেন। লাগাচ্ছেন ফলের গাছ।
টিনের চাল বা ছাদেই নয়, বাড়ির আঙিনা, কার্নিশ ও বারান্দায়ও টবে শাকসবজির চাষাবাদ বেড়েছে। বলা যায়, টব-কৃষির প্রতি ঝুঁকছে মানুষ। গ্রামেও বাড়ির উঠোন, বারান্দা ও টিনের চালে রাখা টবে শাকসবজির চাষাবাদ বাড়ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রধানত অল্প জায়গায় স্বল্প খরচে চাষাবাদ করে নিজের পরিবারের চাহিদা মেটানো যায় বলেই টব কৃষির প্রতি ঝুঁকছেন মানুষ। এছাড়া বিষমুক্ত শাকসবজি ও ফলমূল পাওয়া যায় সেটাও টব কৃষির প্রতি আগ্রহী হওয়ার একটা বড় কারণ। অনেকে শখের বশেও টব কৃষির প্রতি ঝুঁকছেন।
প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে প্রায়ই শাকসবজি ও ফলমূলের দাম বেড়ে যায়। আবার বাজার থেকে আমরা যা কিনে খাচ্ছি তা-ও বিষমুক্ত না। ভেজাল পণ্যে সয়লাব বাজার। অথচ বাড়িতে টবে গাছ রোপন করে অল্প খরচে সহজেই চাষাবাদ করা সম্ভব হয়। এতে বিষমুক্ত খাবার যেমন পাওয়া যায়, তেমনি আর্থিক সাশ্রয়ও হয়।
রাজশাহীর মহানগরীর ছোটবনগ্রাম মহল্লার তাইফুর রহমানও তার বাড়ির টিনের চালে ও আঙিনার এক পাশে টবে শাকসবজি ও ফলের গাছ লাগিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রায় সবজির দাম বেড়ে যায়। ফলমূলে দেয়া হয় রাসায়নিক। বাজারের ভেজাল খাওয়ার চেয়ে বাড়িতে তৈরি করে অল্প খাওয়াই ভালো। আমার বাড়িতে লাউ, কুমড়া, বেগুন, টমেটো, শসা, করল্লা ও লেবুর গাছ রয়েছে। যা উৎপাদন হয় আমাদের পরিবারের চলে যায়।
টবে গাছ লাগিয়ে শাকসবজি ফলান মহানগরীর কাশিয়াডাঙ্গার মোখলেসুর রহমান। তার বাড়ির টিনের চালেও রয়েছে পুঁইশাক, করলা, বেগুন, সিম ও মুলার শাকসবজি।
তিনি বলেন, টিনের চালে অনেক আগে থেকেই আমরা সবজি ফলাই। আগে বাড়ির আঙিনায় মাটিতে শাকসবজি লাগানো হতো। পরে কাণ্ডটি টিনের চালে উঠিয়ে দিতাম। এখন পরিবারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বাড়ির উঠোনে আরো ঘর করতে হয়েছে। ঘর করায় উঠোন বলতে আর কিছু নাই। নার্সারিতে খোঁজ নিয়ে জানলাম টবেই শাকসবজি চাষ করা যায়। তাই নার্সারি থেকে সবজি চারা কিনে নিয়ে এসে টবে চাষাবাদ করছি। জায়গাও কম হয়ে পড়েছে।
উপশহর এলাকার বাসিন্দা আফরোজা আক্তার পলি বলেন, ছাদে ফুলের অনেকগুলো টব আছে। সেই টবের মধ্যে থেকে পাঁচটি টবে লেবু, বেগুন, টমেটো, কমলা ও পেয়ারা চারাগাছ এনে লাগিয়েছি। বেগুন ও লেবু ধরেছে। অন্য গাছে ফল এসেছে।
বাগমারার ঝিকরা গ্রামের কৃষক লুৎফর রহমান বলেন, বাড়ির উঠোনে পুঁইশাক, লাউ ও কুমড়ার চারা লাগিয়েছিলাম। সেগুলো টিনের চালে উঠিয়ে দিয়েছি। সেগুলোতে ভালো সবজি পাওয়া যায়। এর পাশাপাশি লেবু ও বেগুনের কয়েকটি চারা কিনে এনে টবে লাগিয়েছি। সেগুলোও ধরার উপক্রম হয়েছে।
পবার বায়া এলাকার শিক্ষক তৌফিক এলাহী বলেন, ‘ছাদ ফাঁকা পড়ে থাকা দেখে শখের বসেই বছরখানেক আগে বিভিন্ন নার্সারি থেকে চারা কিনে টবে রোপন করেন। শাকসবজির গাছগুলো থেকে এক মাস পর থেকেই উৎপাদন শুরু হয়। বারোমাসই সবজি পাওয়া যায়।
লুৎফুন নাহার বৃষ্টি নামের এক গৃহিণী বলেন, টিনের চাল থেকে পাওয়া শাকসবজি দিয়ে প্রতিদিন বিকেলে বিষমুক্ত সবজি দিয়ে নাস্তা তৈরি করা যায়। নিজেদের চাহিদা মিটিয়েও পাড়াপ্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজনদের দেয়া সম্ভব হয়। এটা খুব ভালো লাগে। তবে টিনের চাল হালকা হওয়ায় ও জায়গা কম থাকায় পরিচর্যা করতে কষ্ট হয়।
নওদাপাড়ায় অবস্থিত মেসার্স মায়ের দোয়া নার্সারির সত্ত্বাধিকারী বায়েজিদ বোস্তামী বলেন, প্রতিদিন গড়ে ১০ জন তো আসেন টবে চাষাবাদের জন্য শাকসবজি ও ফলমূলের চারা নিতে। তবে গ্রামের মানুষদের চেয়ে শহুরে মানুষদের মধ্যে টবে চাষাবাদে আগ্রহ বেশি দেখা যায়। আমার কাছ থেকে শাকসবজির মধ্যে টমেটো, বেগুন, মরিচ বেশি বিক্রি হয়। আর ফলমূলের মধ্যে টবে রেখে লাগানোর জন্য হাইব্রিড চায়না কমলা, মাল্টা, পেয়ারা ও লেবুর চারা বেশি বিক্রি হয়।
বিএডিসির উদ্যান উন্নয়ন কেন্দ্রের পরিদর্শক হামিদা খানম ডেইজি জানান, উদ্যান থেকে প্রতিদিন শত শত চারা বিক্রি হয়। তার মধ্যে ১০০ জনের মধ্যে গড়ে আট থেকে দশ জন পাওয়া যায় যারা টব কৃষির জন্য শাকসবজি ও ফলের গাছের চারা কিনেন।
বিএডিসির উদ্যান উন্নয়ন কেন্দ্রের যুগ্ম পরিচালক মো. আশরাফুল ইসলাম জানান, আমাদের উদ্যান থেকে প্রতিবছর গড়ে আড়াই লাখ শাকসবজির চারা, ৫০ হাজার পেঁপের চারা ও ১৪ হাজার ফলের চারা বিক্রি হয়। এর মধ্যে অনেকে আছেন যারা টব কৃষির জন্য চারা কিনে নিয়ে যান। প্রধানত বেগুন, সিম, টমেটো, পুঁইশাক, করলা, মরিচ, লাউ, শসা, কুমড়া গাছের চারা টব কৃষির জন্য বেশি বিক্রি হয় বলে জানান তিনি।
আশরাফুল ইসলাম আরো জানান, এখন জায়গাজমি অনেক কমে যাচ্ছে। আবার অনেকে শখের বসেও টবে কৃষির চাষাবাদ করেন। এছাড়া নিজে উৎপাদিত শাকসবজি টাটকা পাওয়া যায়। তবে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করা কঠিন বলে জানান তিনি।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. শামসুল হক জানান, ছাদ কৃষি কয়েক বছরের মধ্যেই পরিচিতি পেয়েছে। টিন কৃষিও পরিচিতি পাচ্ছে। সবমিলিয়ে বলা যায়, টবে ফুল গাছের পাশাপাশি টবে কৃষির চাষাবাদেও আগ্রহ বাড়ছে মানুষদের। এটা ভালো দিক। কারণ সবাই যদি সচেতনভাবে নিজেদের বাড়িতে উৎপাদিত পণ্য দিয়ে নিজেদের চাহিদা মেটাতে পারে তাহলে এটা স্বাস্থ্যের পক্ষে যেমন উপকারি, তেমনি আর্থিকভাবেও সাশ্রয় হয় পরিবারটি।
আরএইচএফ/এইচএস