রাষ্ট্র সংস্কার, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং বৈষম্যহীন প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যকে সামনে রেখে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প ও বরাদ্দ পুনর্বিন্যাসের বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন সরকারের রূপরেখা ও উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলমান ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (আরএডিপি) সার্বিক পরিকল্পনা ঢেলে সাজানো হচ্ছে। এতে অগ্রাধিকার পাচ্ছে দ্রুত সমাপ্তিযোগ্য ও জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প, আর কাঙ্ক্ষিত গতি না পাওয়া প্রকল্পগুলোর বাজেট কাটছাঁটের কৌশল নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতেই এই সংশোধনী আনা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে আগামী ২৯ নভেম্বরের মধ্যে অগ্রাধিকারভিত্তিক নতুন অর্থায়ন চাহিদা প্রস্তাব পাঠানোর জন্য সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ ও মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত ১ নভেম্বর পরিকল্পনা কমিশন থেকে জারি করা এক বিশেষ পরিপত্রে ৫৮টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সচিবদের আরএডিপির অর্থায়নের নতুন চাহিদা নিরূপণের এই গাইডলাইন দেওয়া হয়। পরিপত্রে মূলত পাঁচটি মূল ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে- রাষ্ট্র সংস্কার, টেকসই সক্ষমতা ও বৈষম্যহীন উন্নয়ন, ভঙ্গুর অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠন, সুষম আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধি এবং ক্রীড়া-সংস্কৃতির মাধ্যমে সামাজিক সংহতি জোরদার।
বাস্তবায়ন সক্ষমতা বিবেচনায় বরাদ্দ: সংশোধিত এডিপিতে প্রকল্পের চাহিদার পাশাপাশি অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্রকল্প পরিচালকদের অনুমোদিত কর্মপরিকল্পনা, ব্যয়ের সময়সূচি, চলতি অর্থবছরের প্রকৃত ব্যয় এবং অবশিষ্ট সময়ে সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব দিতে হবে। কোনো প্রকল্পের সংশোধিত বরাদ্দ ইতোমধ্যে ব্যয় হওয়া অর্থের চেয়ে কম হতে পারবে না। চলতি এডিপির সব প্রকল্প আরএডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সমাপ্ত প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রকৃত ব্যয়ের পরিমাণ দেখাতে হবে। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরে যেসব প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা, সেগুলোর জন্য পর্যাপ্ত অর্থ নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যয়ে স্বচ্ছতায় ১৬ শর্ত: সংশোধিত অর্থায়নের চাহিদা তৈরিতে ১৬টি শর্ত দিয়েছে কমিশন। প্রকল্পের অব্যয়িত অর্থ ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে ফেরত দেওয়ার পর তা সরকারের সমন্বিত বাজেট ও হিসাবব্যবস্থা (আইবাস++)-এ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অন্যথায় প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে বেশি ব্যয় দেখানোর আশঙ্কা রয়েছে। অতিরিক্ত বরাদ্দ ও পুনঃউপযোজনের তথ্যও সংশোধিত প্রস্তাবে দিতে হবে। অর্থায়নের চাহিদা সর্বশেষ অনুমোদিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) বা সংশোধিত ডিপিপির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। বৈদেশিক অর্থায়ননির্ভর প্রকল্পে ঋণ ও অনুদান চুক্তির মেয়াদ বিবেচনায় নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সুপারিশ করা প্রকল্প ঋণ, অনুদান ও জাপান ঋণ মওকুফ অনুদান কাউন্টারপার্ট ফান্ডের (ডিআরজিএ-সিএফ) বরাদ্দ চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। সরকারি অংশের অর্থায়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইআরডির সর্বশেষ সুপারিশ করা বিনিময় হার অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা নির্ধারণ করতে হবে।
নতুন অগ্রাধিকারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন, সরকারি বিনিয়োগের সুফল বৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, আইসিটি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও মানবসম্পদ উন্নয়ন গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি জলবায়ু অভিযোজন, নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ, খাল খনন, নারীর ক্ষমতায়ন, সুশাসন এবং সমুদ্র অর্থনীতির উন্নয়নও অগ্রাধিকার পাবে। অনুমোদিত বহু বছর মেয়াদি সরকারি বিনিয়োগ কর্মসূচি (এমওয়াইপিআইপি) রয়েছে এমন আটটি খাতকে সংশ্লিষ্ট কাঠামো অনুসরণ করে বরাদ্দের চাহিদা ও ভবিষ্যৎ প্রাক্কলন তৈরি করতে হবে। খাতগুলো হলো শিল্প ও অর্থনৈতিক সেবা, কৃষি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, পরিবহন ও যোগাযোগ, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন, পরিবেশ ও পানিসম্পদ, আবাসন এবং স্বাস্থ্য। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি কর্তৃপক্ষকে (পিপিপিএ) চলমান ও প্রস্তাবিত প্রকল্পের তথ্য এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের প্রকল্পের বিবরণ জমা দিতে হবে।
তিন লাখ কোটি টাকার এডিপি: অর্থ বিভাগ ও ইআরডির সঙ্গে আলোচনা করে আরএডিপির আকার নির্ধারণ করা হবে। এরপর মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দ ঠিক করবে পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগ। অনুমোদন না পাওয়া নতুন প্রকল্পগুলোও খসড়ায় পৃথকভাবে থাকবে। কমিশনের বর্ধিত সভায় চূড়ান্ত হওয়ার পর প্রস্তাব জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। অনুমোদনের পর বরাদ্দের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে এএমএস থেকে আইবাস++-এ স্থানান্তরিত হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এডিপির আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা।