আজ ৪ নভেম্বর, জাতীয় সংবিধান দিবস। ১৯৭২ সালের এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান গণপরিষদে গৃহীত হয়। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক কাঠামো নির্ধারণে এটি ছিল এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। এ বছর সংবিধান গৃহীত হওয়ার ৫৪ বছর পূর্ণ হলো।
বাংলাদেশের সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন। রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা, সরকারের বিভিন্ন বিভাগের ক্ষমতা ও দায়িত্ব, নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এই সংবিধানের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর নতুন রাষ্ট্রের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধান প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন ১১ এপ্রিল ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি করে ৩৪ সদস্যের সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়।
১২ অক্টোবর গণপরিষদে সংবিধানের খসড়া বিল উত্থাপন করা হয়। কয়েক দফা আলোচনা ও সংশোধনীর পর ৪ নভেম্বর গণপরিষদে সংবিধান গৃহীত হয়। পরে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২, মহান বিজয় দিবসে এটি কার্যকর হয়।
১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার চারটি মূলনীতি নির্ধারণ করা হয়েছিল। এগুলো হলো—
১. জাতীয়তাবাদ
২. সমাজতন্ত্র
৩. গণতন্ত্র
৪. ধর্মনিরপেক্ষতা।
এই মূলনীতিগুলোর মাধ্যমে একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক, শোষণমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশের সংবিধানে মোট ১৫৩টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। এগুলো ১১টি ভাগে বিন্যস্ত। পাশাপাশি রয়েছে চারটি তফসিল। সংবিধানে নাগরিকের মৌলিক অধিকার, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা, জাতীয় সংসদ, বিচার বিভাগ, নির্বাচন এবং সরকারি কর্মব্যবস্থাসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সংবিধানের তৃতীয় ভাগে নাগরিকের মৌলিক অধিকার তুলে ধরা হয়েছে। আইনের দৃষ্টিতে সমতা, আইনের আশ্রয় লাভ, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার মতো বিষয় এতে স্থান পেয়েছে।
সংবিধান গৃহীত হওয়ার দিন ৪ নভেম্বরকে ২০২২ সালে জাতীয় সংবিধান দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে দিবসটির সরকারি মর্যাদা নিয়ে পরিবর্তন আসে। তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে ৪ নভেম্বর সংবিধান গৃহীত হওয়ার দিন হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
সংবিধান কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার একটি আইনি দলিল নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের অধিকার, দায়িত্ব এবং পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি। একটি রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা, নাগরিকের স্বাধীনতা রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম পরিচালনায় সংবিধানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের সংবিধান ও আইন মান্য করা, শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সরকারি দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত প্রত্যেক ব্যক্তির দায়িত্ব জনগণের সেবা করা।
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও সংবিধান বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক জীবনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। সংবিধানের বিধান অনুসরণ, নাগরিক অধিকার রক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই এর প্রকৃত তাৎপর্য বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হতে পারে।
এফএস