ভারত থেকে গবাদি পশু আসা বন্ধের পর গত এক দশকে অভ্যন্তরীণ পশু উৎপাদনে এক নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। স্থানীয় খামারি ও উদ্যোক্তাদের হাত ধরে কোরবানি ও সারা বছরের মাংসের চাহিদায় বাংলাদেশ এখন পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ। তবে এই অর্জনের আড়ালে বাড়ছে খামারিদের দুশ্চিন্তা। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে গো-খাদ্য ও কৃত্রিম প্রজনন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় লালন-পালনের ব্যয় এক লাফে ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে মাংস উৎপাদনে স্বাবলম্বী হলেও খামারি ও ভোক্তাদের দিতে হচ্ছে বাড়তি দাম।
খামারি ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গো-খাদ্যের বাজার মূলত আমদানিনির্ভর। গম, ভুট্টা ও সয়াবিনের মতো প্রধান উপাদানগুলোর আমদানিতে দেশের শীর্ষ ১০টি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। বাজারে দাম নির্ধারণেও ভূমিকা রাখছে এসব প্রতিষ্ঠান।
শুধু খাদ্যই নয়, গবাদি পশুর কৃত্রিম প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় ‘সিমেন’ বা বীজের বাজারও এখন বেসরকারি খাতের দখলে। দেশে বছওে প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ ডোজ সিমেনের চাহিদার একটি বড় অংশ জোগান দিচ্ছে ব্র্যাক, এসিআই, আমেরিকান ডেইরিসহ বেশ কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। ডিএলএস-এর (প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর) নিজস্ব সক্ষমতা কমে যাওয়ায় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরতা আরও বেড়েছে।
বাজার তথ্যে দেখা যায়, গত তিন বছরের ব্যবধানে গো-খাদ্যের উপকরণের দাম ৬০ থেকে ৬৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বিভিন্ন কোম্পানির ব্র্যান্ডের ২৫ কেজির ফিডের বস্তায় দাম বেড়েছে ৪৫০ থেকে ৬৫০ টাকা পর্যন্ত।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য তৈরিতে ব্যবহৃত কাঁচামাল যেমন—মাছের তেল, সয়াবিন তেল, ফিশমিল ও আটার দাম ৫ বছরে গড়ে ৭৫ থেকে ১৪৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। খামারিদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম মাঝে কিছুটা কমলেও ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ও আমদানিকারকদের অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতায় দেশে গো-খাদ্যের দাম কমানো হয়নি।
বিভিন্ন খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পশু পালনে প্রতিটি ধাপে খরচ বেড়েছে। কর্মচারীর বেতন ছাড়াও শুধু ভুসি, খড় ও ঘাসের দাম আগের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ছোট থেকে মাঝারি আকারের একটি গরু পালনে আগের তুলনায় অন্তত ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে।
টাঙ্গাইলের খামারি ইমান আলী জানান, খাবারের উচ্চমূল্যের পাশাপাশি বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরাসরি বাজারে বা ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে না পেরে ছোট খামারিরা প্রায়ই সঠিক মূল্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
২০১৪ সালে সীমান্ত পার হয়ে গবাদি পশু পাচারে ভারতের কড়াকড়ির পর দেশে মোটাতাজাকরণ ও দুগ্ধ খাতে বিনিয়োগ দ্রুত বাড়ে। ২০১৫ সালে যেখানে দেশে প্রতি কেজি গরুর মাংসের দাম ছিল ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা, তা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায়। মাংসের বাজার চড়া থাকলেও মুনাফার সুযোগ ও সরকারের স্বল্প সুদের সহজ ঋণের কারণে শিক্ষিত যুবকরা এই খাতে এগিয়ে এসেছেন। বর্তমানে দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৮ লাখ খামার তৈরি হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, দেশে বর্তমানে গবাদি পশুর সংখ্যা ও উৎপাদন ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। তবে খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিডিএফএ) জানিয়েছে, উৎপাদন বাড়লেও গো-খাদ্যের অসংলগ্ন দামের কারণে খামারিরা কাঙ্ক্ষিত মুনাফাবঞ্চিত হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় মাংস ও খামার শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে দ্রুত গো-খাদ্যের বাজারে করপোরেট সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কছাড় এবং সরকারি প্রজনন ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় উৎপাদন বৃদ্ধির এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
এসএ