সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলোকে কার্যকর করা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগপ্রক্রিয়া সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
আসিফ নজরুল বলেন, সংবিধানে যেকোনো ইতিবাচক পরিবর্তনই সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও জনগণের প্রত্যাশাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশেষ কমিটির বৈঠকের পরিবেশ সম্পর্কে তিনি বলেন, সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আলোচনা হয়েছে। কমিটির নেতৃত্বে থাকা সালাহউদ্দিন আহমেদ সবাইকে মতামত প্রকাশের সুযোগ দিচ্ছেন। অংশগ্রহণকারীরাও স্বাধীনভাবে বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য রাখছেন। সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ বিধান, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর করার বিষয়গুলো আলোচনায় এসেছে।
তিনি জানান, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, নির্বাহী কাঠামোয় ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলোকে আরও ক্ষমতাবান করা এবং বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের পদ্ধতি নিয়েও মতবিনিময় হয়েছে।
সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানোর বিষয়ে আসিফ নজরুল বলেন, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থায়ী কমিটির প্রধান হিসেবে বিরোধী দলের সদস্যদের রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে। সংসদীয় কার্যক্রমে জবাবদিহি ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় এসব কমিটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কমিটিগুলো যাতে স্বাধীনভাবে ও কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলো যাতে যথাযথভাবে কাজ করতে পারে, সে জন্য ওই অনুচ্ছেদে আইন প্রণয়নের যে সুযোগ রয়েছে, তা কাজে লাগানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে স্থায়ী কমিটির প্রধান পদে বিরোধী দলের সদস্যদের রাখার প্রস্তাবের বিষয়ে বৈঠকে কোনো উত্তর দেওয়া হয়নি।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে আসিফ নজরুল বলেন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ আইন এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় আইন বাদ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবে হতাশা প্রকাশ করেছেন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুদৃঢ় করতে বিচারক নিয়োগের স্বচ্ছ ও কার্যকর ব্যবস্থা এবং বিচার বিভাগের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, বিএনপির নিজস্ব অঙ্গীকারেও এসব উদ্যোগের পক্ষে অবস্থান ছিল বলে বৈঠকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি। এ সময় আইনমন্ত্রী তাঁকে জানিয়েছেন, বিষয়গুলো পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়নি; পরবর্তী সময়ে এসব নিয়ে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে এসব আইন প্রণয়নের উদ্যোগ কীভাবে এগোয়, তা গুরুত্বপূর্ণ।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়েও বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানান আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত বিতর্কিত ও সংবেদনশীল হওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতৈক্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিষয়ে একাধিক পদ্ধতির উল্লেখ রয়েছে। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রস্তাবিত নয়টি পদ্ধতির মধ্যে আটটি বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে, আর একটি বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
আসিফ নজরুল বলেন, একটি বিষয়ে মতভেদের কারণে পুরো প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত না করে সংশ্লিষ্ট বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো উচিত। এ বিষয়ে বিরোধী দলের সদস্যদেরও আলোচনায় যুক্ত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। কমিটির পক্ষ থেকে তাঁকে জানানো হয়েছে, এ বিষয়ে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করা হয়েছে এবং উদ্যোগের বিস্তারিত ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে।
সংবিধান সংশোধনের পুরো প্রক্রিয়ায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা যেন উপেক্ষিত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক করেছেন তিনি। আসিফ নজরুল বলেন, বর্তমান কমিটির আলোচনা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে হচ্ছে। তাই অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আরও কার্যকর ও ইতিবাচক পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
নিজের অতীত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১১ সালে সংসদীয় সংবিধান সংশোধন কমিটির বৈঠকে আমন্ত্রণ পেয়ে তিনি মতামত দিয়েছিলেন। তখন অনেক প্রত্যাশা নিয়ে অংশ নিলেও পরবর্তী সময়ে তা পূরণ হয়নি। এবারও যেন একই ধরনের হতাশার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মানুষের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগে প্রতিফলিত হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নির্বাচনব্যবস্থা ও সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানান আসিফ নজরুল। পাশাপাশি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগপদ্ধতি পর্যালোচনা এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এসব বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি; কমিটির কার্যক্রম আলোচনা ও মতবিনিময়ের পর্যায়েই রয়েছে।
গণভোট আয়োজন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন কিংবা সংবিধান সংশোধন কমিটির মাধ্যমে পরিবর্তন আনার বিষয়ে আসিফ নজরুল বলেন, বিষয়টি বর্তমানে রাজনৈতিক বিতর্ক ও মতপার্থক্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিতর্কে জড়াতে চান না জানিয়ে তিনি বলেন, সংবিধানে কোনো পরিবর্তন ইতিবাচক হলে সেটিকে সংস্কার হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
তিনি আরও বলেন, সংবিধান পরিবর্তনে কোন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে, তার চেয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে কি না, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরিবর্তনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও কার্যকর হচ্ছে কি না, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে কি না এবং মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে কি না, সেদিকেই বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
-টিএস