ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
প্যারিস নয়, তবু এক টুকরো প্যারিসের গল্প
✎ অবজারভার ডিজিটাল ডেস্ক
⏲ প্রকাশিত: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৫৮ পিএম
সংগৃহীত ছবি
X
Advertisement

সংগৃহীত ছবি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) কাজলা ফটক পেরিয়ে এগোতেই চোখে পড়ে দীর্ঘ এক ছায়াঘেরা পথ। দুই পাশে সারি সারি আকাশছোঁয়া গগনশিরীষগাছ। মাথার ওপর ডালপালার সবুজ ছাউনি। পাতার ফাঁক গলে সূর্যের আলো এসে পড়ে পিচঢালা সড়কে। বাতাসের সঙ্গে গাছের পাতার মৃদু শব্দ আর পথচারীদের আনাগোনায় তৈরি হয় এক অন্য রকম পরিবেশ। এই পথের নাম প্যারিস রোড। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক।

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এমন নামের রাস্তা কেন, তা নিয়ে রয়েছে নানা গল্প। তবে নামের ইতিহাসের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে এই সড়ককে ঘিরে শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা। কারও কাছে এটি বন্ধুত্বের ঠিকানা, কারও কাছে প্রথম প্রেমের স্মৃতি, আবার কারও কাছে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা ফটক এলাকা থেকে শের-ই-বাংলা ফজলুল হক হলের দিকে বিস্তৃত প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক। দুই পাশের সুউচ্চ গগনশিরীষগাছ একে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য বাড়াতে ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসব গাছ লাগানো হয় বলে জানা যায়। সময়ের সঙ্গে গাছগুলো বড় হয়েছে, আর প্যারিস রোড হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাসের অন্যতম আকর্ষণ।

প্যারিস রোডের নামকরণ নিয়েও রয়েছে কৌতূহল। প্রচলিত একটি ধারণা অনুযায়ী, ফ্রান্সের প্যারিস শহরের গাছঘেরা সড়কের সঙ্গে মিল থাকায় এর এমন নামকরণ। তবে নামটির উৎপত্তি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য লিখিত প্রমাণ স্পষ্ট নয়। তাতে অবশ্য শিক্ষার্থীদের ভালোবাসায় কোনো ঘাটতি নেই। তাঁদের কাছে প্যারিস রোড মানেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনন্য পরিচয়।

সকাল থেকে সন্ধ্যা—প্রতিটি সময়েই প্যারিস রোডের রূপ আলাদা। সকালের কোমল রোদে গাছের ছায়া পড়ে রাস্তার ওপর। দুপুরে তীব্র গরমের মধ্যেও পথচারীদের স্বস্তি দেয় সবুজের আচ্ছাদন। বিকেলে শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে হাঁটেন, কেউ গল্পে মেতে ওঠেন, আবার কেউ ব্যস্ত থাকেন ছবি তুলতে। বিশেষ করে নবীন শিক্ষার্থীদের কাছে প্যারিস রোড যেন ক্যাম্পাসে আসার পর প্রথম দেখার মতো একটি জায়গা।

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের অসংখ্য স্মৃতিও জড়িয়ে আছে এই পথের সঙ্গে। ক্লাস শেষে বন্ধুদের আড্ডা, পরীক্ষার আগে দুশ্চিন্তা নিয়ে হাঁটা, প্রিয় মানুষের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত কিংবা সমাবর্তনের দিনে শেষবারের মতো ছবি তোলা—সবকিছুর নীরব সাক্ষী হয়ে আছে প্যারিস রোড। পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষার্থীরা যখন ক্যাম্পাস ছেড়ে যান, তখন পরিচিত এই পথও হয়ে ওঠে বিদায়ের আবেগমাখা অংশ।

শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য কিংবা ব্যক্তিগত স্মৃতিই নয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসেও রয়েছে প্যারিস রোডের উপস্থিতি। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ের মিছিল, প্রতিবাদ সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে মুখর হয়েছে এই সড়ক। এর সঙ্গে সংযুক্ত জোহা চত্বর। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে নিহত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. সৈয়দ মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা। তাঁর আত্মত্যাগের স্মৃতি ধারণ করে আছে এই চত্বর।

তবে সময়ের সঙ্গে প্যারিস রোডের সৌন্দর্য রক্ষা নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। বয়সের ভারে কিছু গাছ দুর্বল হয়ে পড়েছে, কোথাও ডাল ভেঙে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। বিভিন্ন সময়ে গাছে পেরেক ঠুকে ব্যানার-ফেস্টুন লাগানোর অভিযোগ উঠেছে। এসব কারণে ঐতিহ্যবাহী গাছগুলোর সুরক্ষা ও নিয়মিত পরিচর্যার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। কারণ গাছগুলোই এই সড়কের প্রধান সৌন্দর্য। সেগুলো হারিয়ে গেলে প্যারিস রোডও হারাবে তার চিরচেনা রূপ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থীদের কাছে প্যারিস রোড প্রতিদিনের চেনা পথ হলেও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের কাছে এর আবেদন অন্য রকম। দীর্ঘদিন পর ক্যাম্পাসে ফিরে অনেকেই খুঁজে ফেরেন পুরোনো দিনের সেই পরিচিত দৃশ্য। গাছের নিচে দাঁড়িয়ে মনে পড়ে বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সময়, হাসি-আনন্দ আর ফেলে আসা তারুণ্যের দিনগুলো। সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, কিন্তু স্মৃতিতে প্যারিস রোড থেকে যায় আগের মতোই।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে অসংখ্য স্থাপনা, সবুজ প্রান্তর ও ঐতিহাসিক স্থান। কিন্তু প্যারিস রোডের আবেদন যেন একটু আলাদা। এখানে প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে মিশে আছে ইতিহাস, তারুণ্য, ভালোবাসা ও আবেগ। একটি সাধারণ রাস্তা কীভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্মের মানুষের স্মৃতির অংশ হয়ে উঠতে পারে, তারই অনন্য উদাহরণ প্যারিস রোড।

পৃথিবীর বিখ্যাত প্যারিস শহরে হয়তো আইফেল টাওয়ার আছে, আছে আলোঝলমলে রাজপথ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোডে সেসব কিছুই নেই। এখানে আছে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা গগনশিরীষ, সবুজের স্নিগ্ধতা আর হাজারো শিক্ষার্থীর ফেলে আসা গল্প।
Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝
Advertisement