রাইডারদের আয়-ব্যয় ও পেনাল্টি নিয়ে অসন্তোষ, কমিশন কমানোর দাবিতে সরব রেস্তোরাঁ মালিকেরা, গ্রাহকদেরও রয়েছে নানা অভিযোগ
অনলাইনে
খাবার অর্ডার ও ডেলিভারি সেবায় জনপ্রিয়তা পাওয়া ফুডপান্ডাকে ঘিরে একের পর
এক অভিযোগ সামনে আসছে। রাইডারদের পারিশ্রমিক ও কর্মপরিবেশ, রেস্তোরাঁ
মালিকদের কমিশন ও অতিরিক্ত চার্জ এবং গ্রাহকদের ডেলিভারি ও
রিফান্ড-সংক্রান্ত ভোগান্তি নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির
কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা ও
গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। সব মিলিয়ে অনলাইন খাবার
সরবরাহের এই প্ল্যাটফর্মের ব্যবসায়িক নীতি, সেবার মান ও জবাবদিহি নিয়ে
প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ।
রাইডারদের অভিযোগ, পরিশ্রমের তুলনায় আয় কমফুডপান্ডার
ডেলিভারি কার্যক্রমে যুক্ত রাইডারদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় কাজ করেও
প্রত্যাশিত আয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। দৈনিক উপার্জন থেকে মোটরসাইকেল বা
বাইসাইকেল রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি, মোবাইল ডেটা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ
বাদ দেওয়ার পর হাতে খুব বেশি অর্থ থাকে না বলে দাবি তাঁদের।
রাইডারদের
অসন্তোষের অন্যতম কারণ দূরত্ব ও কাজের চাপের তুলনায় কম ডেলিভারি চার্জ এবং
ইনসেনটিভ পাওয়ার কঠিন শর্ত। তাঁদের ভাষ্য, দীর্ঘ যানজট পেরিয়ে গন্তব্যে
পৌঁছানো, রেস্তোরাঁয় খাবার প্রস্তুত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করা এবং একাধিক
অর্ডার সামলানোর পরও উপার্জন প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ে না।
রাইডারদের
মতে, দৈনিক আয় থেকে জ্বালানি, মোবাইল ডেটা ও যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণের খরচ
বাদ দিলে হাতে খুব বেশি অর্থ থাকে না। তাই ডেলিভারির দূরত্ব, সময় ও কাজের
চাপ বিবেচনায় পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
যানজটের দায়ও রাইডারদের?পারিশ্রমিকের
পাশাপাশি পেনাল্টি ও অ্যাকাউন্ট স্থগিতের ব্যবস্থা নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে
রাইডারদের মধ্যে। তাঁদের অভিযোগ, অর্ডার বাতিল, ডেলিভারিতে বিলম্ব কিংবা
গ্রাহকের অসন্তোষের ঘটনায় যথাযথ যাচাই ছাড়াই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
রাইডারদের
বক্তব্য, তীব্র যানজট, রেস্তোরাঁয় খাবার তৈরি হতে দেরি কিংবা গ্রাহকের
সঠিক অবস্থান খুঁজে পেতে সমস্যার মতো পরিস্থিতি তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে
থাকতে পারে। তারপরও এসব কারণে ডেলিভারি দিতে দেরি হলে এর দায় অনেক সময়
তাঁদের ওপর বর্তায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাইডারদের মতে, যানজট বা
রেস্তোরাঁয় খাবার প্রস্তুত হতে দেরি হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডেলিভারি
দেওয়া সব সময় সম্ভব হয় না। তাই কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে
সংশ্লিষ্ট রাইডারের বক্তব্য শোনা এবং নিরপেক্ষভাবে ঘটনা যাচাই করা জরুরি।
দুর্ঘটনায় সুরক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় নিয়েও উদ্বেগরাইডারদের
অভিযোগ, রোদ-বৃষ্টি, যানজট ও ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে কাজ করলেও দুর্ঘটনা বা
অসুস্থতার সময় আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকে। দুর্ঘটনায় চিকিৎসার
ব্যয় বহন করা এবং কাজ বন্ধ থাকাকালে আয় হারানো তাঁদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি
করে।
দুর্ঘটনায় পড়লে চিকিৎসার খরচের পাশাপাশি কাজ বন্ধ থাকার কারণে
উপার্জনও কমে যায় বলে রাইডারদের ভাষ্য। এ পরিস্থিতিতে দুর্ঘটনাবিমা, জরুরি
সহায়তা ও ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
রাইডারদের
দাবি, ডেলিভারি চার্জ পুনর্বিবেচনার পাশাপাশি দুর্ঘটনা ও অসুস্থতার সময়
সহায়তা, জরিমানার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর
ব্যবস্থা চালু করা উচিত।
কমিশন ও অতিরিক্ত চার্জে চাপে রেস্তোরাঁ মালিকেরাফুডপান্ডাকে
ঘিরে অসন্তোষের আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো রেস্তোরাঁর কমিশন ও বিভিন্ন চার্জ।
রেস্তোরাঁ মালিকদের অভিযোগ, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অর্ডার বাড়লেও
কমিশন, বিজ্ঞাপন ব্যয়, প্রচারমূলক কার্যক্রম এবং বিভিন্ন আনুষঙ্গিক খরচ
মেটানোর পর প্রত্যাশিত মুনাফা থাকে না।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি
রেস্তোরাঁগুলোর জন্য এ ধরনের ব্যয় সামলে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে
বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। খাবার তৈরির উপকরণ, কর্মীদের বেতন, প্যাকেজিং,
গ্যাস-বিদ্যুৎ ও দোকান পরিচালনার খরচের সঙ্গে প্ল্যাটফর্মের চার্জ যুক্ত
হওয়ায় লাভের পরিমাণ কমে যায়।
রেস্তোরাঁ মালিকদের আরও অভিযোগ,
কমিশনের বাইরে বিজ্ঞাপন, প্রিমিয়াম প্লেসমেন্ট ও বিভিন্ন ডিসকাউন্ট
কর্মসূচিতে অংশ নিতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। ফলে বিক্রির পরিমাণ
বাড়লেও প্রকৃত মুনাফার হিসাব প্রত্যাশার সঙ্গে মেলে না।
এ ছাড়া
পেমেন্ট নিষ্পত্তি, বিভিন্ন খাতে অর্থ কর্তন এবং বিক্রির বিপরীতে প্রকৃত
প্রাপ্য অর্থের হিসাব নিয়েও স্বচ্ছতা চান ব্যবসায়ীরা। তাঁদের দাবি, কমিশন ও
অন্যান্য চার্জের বিস্তারিত হিসাব সহজবোধ্যভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
চট্টগ্রামে ফুডপান্ডা বন্ধের হুঁশিয়ারিকমিশন
ও অতিরিক্ত চার্জ নিয়ে বিরোধের জেরে চট্টগ্রামে ফুডপান্ডার কার্যক্রম বন্ধ
রাখার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির চট্টগ্রাম
মহানগর শাখা।
সংগঠনটির ঘোষণায় ৬ অক্টোবর থেকে সংশ্লিষ্ট
রেস্তোরাঁগুলোকে ফুডপান্ডার অর্ডার গ্রহণের ট্যাব বন্ধ রাখার নির্দেশনা
দেওয়ার কথা জানানো হয়। কমিশন ও বিভিন্ন চার্জের বিষয়ে লিখিত দাবি জানানোর
পরও গ্রহণযোগ্য সমাধান না পাওয়ার অভিযোগ তুলে এ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া
হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে ১০ অক্টোবর চট্টগ্রামের মুরাদপুর এলাকায়
আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রেস্তোরাঁ মালিকেরা তাঁদের দাবি বাস্তবায়নে সাত
দিনের সময়সীমা বেঁধে দেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমাধান না হলে আরও কঠোর
কর্মসূচি নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তাঁরা।
ব্যবসায়ীদের দাবির মধ্যে
রয়েছে কমিশন কাঠামো পুনর্বিবেচনা, অতিরিক্ত চার্জের স্বচ্ছ হিসাব, অর্ডার
বাতিলের ক্ষেত্রে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এবং রেস্তোরাঁর আর্থিক স্বার্থ
সুরক্ষার ব্যবস্থা।
অন্যদিকে ফুডপান্ডা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে,
রেস্তোরাঁ অংশীদারদের সঙ্গে তাদের সরাসরি চুক্তি রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট
উদ্বেগ নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য, সেবা বন্ধ থাকলে
রেস্তোরাঁর বিক্রি, রাইডারদের আয় ও গ্রাহকদের সেবাপ্রাপ্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে
পারে। তাই আলোচনার মাধ্যমে বিরোধের সমাধান চায় তারা।
ডেলিভারি দেরি, ভুল অর্ডার ও রিফান্ড নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগরাইডার
ও রেস্তোরাঁ মালিকদের পাশাপাশি ফুডপান্ডার সেবা নিয়ে গ্রাহকদেরও নানা
অভিযোগ রয়েছে। খাবার পৌঁছাতে দেরি, ভুল বা অসম্পূর্ণ অর্ডার, অর্ডার বাতিল
এবং অর্থ ফেরত পেতে দীর্ঘ অপেক্ষার মতো সমস্যা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন
গ্রাহকদের অনেকে।
অভিযোগ রয়েছে, অ্যাপে দেখানো সম্ভাব্য সময়ের
তুলনায় বাস্তবে বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে খাবার ঠান্ডা
হয়ে যায় বা প্রত্যাশিত মান বজায় থাকে না।
ফুডপান্ডার ব্যাখ্যা
অনুযায়ী, যানজট, দূরত্ব, আবহাওয়া কিংবা একাধিক ডেলিভারির কারণে খাবার
পৌঁছাতে সময় বেশি লাগতে পারে। তবে গ্রাহকদের অভিযোগ, সমস্যা দেখা দিলে
দ্রুত সহায়তা পাওয়া সব সময় সহজ হয় না।
ভুল অর্ডার, অসম্পূর্ণ খাবার
কিংবা বাতিল হওয়া অর্ডারের অর্থ ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
গ্রাহকদের দাবি, অভিযোগ জানানোর পর দ্রুত সমাধান, রিফান্ডের স্পষ্ট
সময়সীমা এবং অর্থ ফেরতের পদ্ধতি সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য নিশ্চিত করা
প্রয়োজন।
ভোক্তা অধিদপ্তরেও উঠেছে অভিযোগফুডপান্ডার
সেবা নিয়ে অভিযোগ জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর পর্যন্ত গড়িয়েছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফুডপান্ডা ও দারাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে
অধিদপ্তর।
বৈঠকে অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা, যথাসময়ে পণ্য ও সেবা
সরবরাহ এবং নির্ধারিত সময়ে সেবা দিতে ব্যর্থ হলে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী
মূল্য ফেরত দেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। অনলাইন ব্যবসার নীতিমালা ও
গ্রাহকদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ আরও কার্যকর করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এ ধরনের উদ্যোগের পরও গ্রাহকদের অভিযোগের দ্রুত ও কার্যকর নিষ্পত্তি কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
পাঁচ শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাফুডপান্ডাকে
ঘিরে আলোচনার মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির পাঁচ শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে করা
মামলাও নতুন করে সামনে এসেছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার একটি আদালত পৃথক দুটি
মামলায় তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন বলে বিভিন্ন
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরোয়ানার আওতায় থাকা কর্মকর্তারা হলেন
ফুডপান্ডা বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দা আমবারীন রেজা,
সহপ্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক জুবায়ের সিদ্দিকী, পান্ডামার্টের পরিচালক মো.
তাবরেজ খান, হেড অব ক্যাটাগরি দিলারা ফারুক এবং সিনিয়র ম্যানেজার মোহাম্মদ
সাজেদুল হক।
‘প্রোটিন অ্যান্ড পেরিশেবল’ প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী
শিহাব মাহমুদ বশিরের করা মামলাগুলোতে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা আত্মসাতের
অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, পান্ডামার্টে পণ্য
সরবরাহের পর পাওনা অর্থ পরিশোধে অনিয়ম, পণ্য ফেরত দেখানোর ক্ষেত্রে ভুয়া
চালান তৈরি এবং বিভিন্ন খাতে অর্থ কর্তনের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগকারী দাবি
করেছেন।
ফুডপান্ডার মূল প্রতিষ্ঠানের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডেলিভারি
হিরো স্টোরস (বাংলাদেশ) অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, বিরোধটি
মূলত ব্যবসায়িক লেনদেনসংক্রান্ত। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, সংশ্লিষ্ট
কর্মকর্তারা কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত নন এবং তাঁরা হাইকোর্ট থেকে
আগাম জামিন পেয়েছেন।
জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের দাবিফুডপান্ডাকে
ঘিরে রাইডার, রেস্তোরাঁ মালিক ও গ্রাহকদের অভিযোগগুলো অনলাইন খাবার সরবরাহ
খাতের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে। এর মধ্যে রয়েছে ন্যায্য
পারিশ্রমিক, কমিশন ও চার্জের স্বচ্ছতা, গ্রাহকসেবার মান এবং অভিযোগ
নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা।
সব মিলিয়ে, ফুডপান্ডাকে ঘিরে চলমান
বিরোধের সমাধান নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কার্যকর আলোচনা,
ব্যবসায়িক শর্তের স্বচ্ছতা এবং অভিযোগের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর।