আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের অধীনে নিজ দেশে ফিরে নতুন করে জীবন গড়ার চেষ্টায় রেকর্ডসংখ্যক আফগান নাগরিক নানা সংকটে পড়েছেন। এই সংকটের মধ্যে তালেবান কর্তৃপক্ষের হাতে দেশটির নারী ও কিশোরীরা গ্রেফতার, আটক ও গ্রেফতার হুমকির শিকার হচ্ছেন বলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) এমন তথ্য দিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ।
জাতিসংঘের আফগানিস্তান সহায়তা মিশন (ইউএনএএমএ) নিশ্চিত করেছে যে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে হেরাত ও কাবুলে অন্তত ৫২ নারী ও এক কিশোরীকে গ্রেফতার বা আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও কয়েকজন নারীকে গ্রেফতারের হুমকি দেওয়া হয়েছে।
মিশনটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। কারণ, ভয় ও সামাজিক কলঙ্কের আশঙ্কায় অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না।
নির্যাতনের ধারাবাহিক চিত্র
২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর থেকে আফগানিস্তানে নারী ও কিশোরীদের অধিকার কঠোরভাবে সীমিত করা হয়েছে। তাদের মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ ও চাকরি করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে এবং জনপরিসরে তাদের উপস্থিতিও সীমিত করে রাখা হয়েছে।
ইউএনএএমএর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক গ্রেফতারের ঘটনাগুলোর সঙ্গে তালেবান কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত পোশাকবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ জড়িত। চাদর না পরা, চুল দেখা যাওয়া, রঙিন ওড়না ব্যবহার বা মেকআপ করা কিংবা মাহরাম অর্থাৎ পুরুষ অভিভাবক ছাড়া জনসমক্ষে বের হওয়ার কারণে অনেক নারীকে আটক করা হয়েছে।
মিশনটি জানিয়েছে, কয়েক ঘণ্টা আটক থাকার পর ওই নারীদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
মারধর ও হুমকির অভিযোগ
নারীদের; এমনকি নারী দোকানদারদেরও মৌখিক নিগ্রহ, মারধর ও হুমকি দেওয়ার বিভিন্ন ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউএনএএমএ। এ ধরনের কর্মকাণ্ড নারী ও কিশোরীদের চলাচলের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং নিজেদের বিষয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারের লঙ্ঘন বলে পুনর্ব্যক্ত করেছে মিশন।
জাতিসংঘের মতে, গ্রেফতার ও আটকের ঘটনা নারী ও কিশোরীদের সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায় এবং তাদের আরও বেশি প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দেয়।
নারী ও কিশোরীদের লক্ষ্য করে বৈষম্যমূলক আইন প্রয়োগ বন্ধ করতে তালেবান কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে মিশনটি। একই সঙ্গে সব আফগানের মানবাধিকার ও মর্যাদা রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অধীনে আফগানিস্তানের অঙ্গীকার পূরণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
রেকর্ডসংখ্যক আফগান নাগরিকের প্রত্যাবর্তন
২০২৩ সাল থেকে ইরান ও পাকিস্তান হতে আফগানিস্তানে ফিরে আসা প্রায় ৬৫ লাখ মানুষের পুনর্বাসনের পথে গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা ও প্রতিবন্ধকতা নিয়ে নতুন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)।
আফগানিস্তানে আইওএমের মিশনপ্রধান মিয়ুং পার্ক বলেন, বিপুলসংখ্যক মানুষ দ্রুতগতিতে দেশে ফিরছেন। তাই শুধু সীমান্তে পৌঁছানোর পরপরই নয়; তাদের দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ফিরে আসা অনেক আফগান নাগরিক দেশে থেকে নতুন করে জীবন গড়তে চান। কিন্তু জীবিকা, নিরাপদ আশ্রয়, প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও মৌলিক সেবা পাওয়ার সুযোগের ওপর তাদের সেই সক্ষমতা নির্ভর করছে। পাশাপাশি যেসব স্থানীয় জনগোষ্ঠী তাদের আশ্রয় দিচ্ছে সেসব সম্প্রদায়কেও সহায়তা করা জরুরি।
আইওএমের রিটার্নি রেজিলিয়েন্স ওভারভিউ শীর্ষক প্রতিবেদনে নথিপত্রবিহীন প্রত্যাবর্তনকারী পরিবার এবং আফগানিস্তানে ফেরার পর অন্তত আট মাস ধরে অবস্থান করছেন-এমন ব্যক্তিদের পরিস্থিতিও পর্যালোচনা করা হয়েছে।
শিক্ষা ও দক্ষতা
১৪ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে ৫৩ শতাংশের কোনো শিক্ষাস্তর সম্পন্ন হয়নি। অর্ধেকের বিশেষায়িত কাজের অভিজ্ঞতা নেই। সাক্ষাৎকারের আগের ৩০ দিনে ৬৯ শতাংশ কোনো চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন না।
পরিবার নিয়ে প্রত্যাবর্তন: ৮২ শতাংশ পরিবার হিসেবে দেশে ফিরেছেন। প্রতিটি পরিবারের সদস্যসংখ্যা গড়ে ৬ দশমিক ১ জন।
শিশু ও কিশোর
প্রত্যাবর্তনকারীদের ৫৮ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে।
আবাসন সংকট
৭৭ শতাংশ অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছেন। অন্যদিকে, ৫১ শতাংশের পর্যাপ্ত বসবাসের জায়গা নেই।
নথিপত্রের অভাব
জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারের মাত্র ২১ শতাংশ জানিয়েছে, পরিবারের সব সদস্যের প্রয়োজনীয় নথিপত্র রয়েছে। বিপরীতে, ৪৩ শতাংশের সংশ্লিষ্ট সেবা পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র নেই।
দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের আহ্বান
আইওএম বলেছে, দেশে ফিরে আসা মানুষের সহায়তা শুধু আগমনের সময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। তাদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের জন্য ধারাবাহিক বিনিয়োগ প্রয়োজন।
জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থাটি প্রত্যাবর্তনকারী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য এলাকাভিত্তিক পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে। এসব কার্যক্রমে জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি, নিরাপদ আবাসন, প্রয়োজনীয় নথিপত্র পেতে সহায়তা এবং মৌলিক সেবায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটির মতে, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা এবং সামাজিক সংহতি গড়ে তুলতে এসব উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
টিআই