নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বর্নো রাজ্যে অপহরণ এখন শুধু নিরাপত্তা সংকট নয়, পরিবারগুলোর জন্য ভয়াবহ আর্থিক ও মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। স্বজনকে মুক্ত করতে পরিবারগুলো গবাদিপশু বিক্রি, ঋণ নেওয়া, সম্পত্তি বিক্রি এবং সঞ্চয় ভাঙতে বাধ্য হচ্ছে। একই সঙ্গে অপহরণের আতঙ্কে অনেক পরিবার সন্তানদের স্কুলে পাঠাতেও ভয় পাচ্ছে।
মুসা আবদুল্লাহি ওয়াকাওয়ার স্ত্রী ও সাত বছরের ছেলে অপহৃত হওয়ার পর তাকে সবচেয়ে বেশি ভাবতে হয়েছে মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করা নিয়ে। বর্নোর বহু পরিবার এখন একই বাস্তবতার মুখোমুখি।
গত ১৩ জানুয়ারি বর্নোর বিউ বুরাতাই সড়ক থেকে লারাবা দাউদার বোনকে অপহরণ করা হয়। অপহরণের পর তিনি ফোন করে জানান, বন্দুকধারীরা তাদের জঙ্গলের মধ্যে নিয়ে গেছে। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ নেই। পরিবারের কাছে তিনি জীবিত আছেন কি না, সেটিও অজানা।
আরেক পরিবারে অনিশ্চয়তা নেমে আসে মার্চে। আনজিকউই হেনার ছেলে পড়াশোনা শেষ করে কাজের সন্ধানে মাইদুগুরি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ৩০ মার্চ তাকে অপহরণ করা হয়। কয়েক মাস পরও তার কোনো সন্ধান পায়নি পরিবার।
স্কুলও নিরাপদ নয়
অপহরণের প্রভাব পড়েছে বর্নোর শিক্ষা ব্যবস্থায়ও। আস্কিরা-উবা স্থানীয় সরকার এলাকায় ১১৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৫৬টি চালু রয়েছে। মে মাসে মুসা এলাকায় হামলার আগে চালু ছিল ৭৬টি। হামলার পর আরও ২০টি স্কুল বন্ধ হয়ে যায়।
১৫ মে মুসায় সন্দেহভাজন বিদ্রোহীরা হামলা চালিয়ে বহু শিশুকে অপহরণ করে। পরবর্তী সময়ে একটি তালিকায় ৪০ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। বর্নো সরকার পরে জানিয়েছে, প্রায় ৪৪ শিশু এখনো নিখোঁজ।
এরপর ২৯ জুন লাসায় একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে জাতীয় পরীক্ষা চলাকালে হামলা চালানো হয়। কয়েকজন শিক্ষার্থী উদ্ধার হলেও ৩৬ শিক্ষার্থী ও এক শিক্ষক বন্দি রয়েছেন বলে জানা গেছে।
মুক্তিপণ এখন বড় ব্যবসা
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল নাইজেরিয়ার হিসাবে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত দেশজুড়ে অন্তত ১,১০০ মানুষ অপহৃত হয়েছেন। তবে প্রত্যন্ত এলাকায় বহু ঘটনা প্রকাশ্যে না আসায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
সংস্থাটির নাইজেরিয়া পরিচালক ইসা সানুসি বলেন, অপহরণকারীরা এখন বিপুল মুক্তিপণের আশায় ব্যাপকভাবে মানুষকে টার্গেট করছে। বন্দিদের কেউ কেউ মাসের পর মাস বন্দুকধারীদের হাতে নির্যাতন, অনাহার ও যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক অধ্যাপক খলিফা দিকওয়া বলেন, মুক্তিপণের জন্য অপহরণ এখন লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। মুক্তিপণের অর্থ দিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো অস্ত্র কিনছে এবং নতুন সদস্য নিয়োগ করছে। ফলে একটি পরিবার স্বজনকে উদ্ধারে অর্থ দেওয়ার পর সেই অর্থই আবার পরবর্তী অপহরণের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
সরকারের দাবি, অভিযান চলছে
বর্নো রাজ্যের তথ্য ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাবিষয়ক কমিশনার উসমান তার বলেছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সামরিক ও বেসামরিক দুই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সামরিক বাহিনী ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি নজরদারি ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে।
তার দাবি, নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতায় কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় হামলা কমেছে। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও অশিক্ষার মতো সামাজিক সমস্যাও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সংকটের সঙ্গে জড়িত।
বর্নোর পরিবারগুলোর কাছে অবশ্য এসব পদক্ষেপের চেয়ে বড় প্রশ্ন এখনো একটাই অপহৃত স্বজনেরা কবে বাড়ি ফিরবেন।
একদিকে মুক্তিপণের জন্য সম্পদ বিক্রি, অন্যদিকে সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর ঝুঁকি দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতা বর্নোর পরিবারগুলোর স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকেই বদলে দিচ্ছে।
এফএস