আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নতুন ও বড় অঙ্কের ঋণ পেতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংক খাতের সংস্কার, ভর্তুকির লাগাম টানা এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানো—এই চার বড় শর্ত পূরণে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে সরকারকে। সরকারের মূল লক্ষ্য, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের নতুন ঋণচুক্তি চূড়ান্ত করা এবং আগামী বছরের শুরুতে প্রথম কিস্তি নিশ্চিত করা।
চলমান ঋণ কর্মসূচির ষষ্ঠ কিস্তি ছাড় এবং নতুন ঋণের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে আগামী ২৯ অক্টোবর ঢাকায় আসার কথা রয়েছে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদলের। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের উন্নয়ন সামষ্টিক অর্থনীতি বিভাগের প্রধান ক্রিস পাপাজিওর নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, এনবিআর, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেবে। দুই সপ্তাহের এই সফরে আগের পাঁচ কিস্তির শর্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতিও নিবিড়ভাবে যাচাই করা হবে। এর আগে আগামী ১৩ থেকে ১৭ অক্টোবর ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভাতেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।
নতুন ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে রাজস্ব আদায়কে। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরেই আশানুরূপ নয়। ফলে সরকারের ব্যয়ের সক্ষমতা বাড়ার পরিবর্তে বাজেট ঘাটতি ও সরকারি ঋণের চাপ বাড়ছে। আইএমএফের সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও কম রাজস্ব আহরণকে অর্থনীতির অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রাজস্ব আয় না বাড়ালে সামাজিক সুরক্ষা, উন্নয়ন ও জনসেবামূলক খাতে প্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। এ কারণে এবারের আলোচনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের অগ্রগতি, করের আওতা বৃদ্ধি এবং কর প্রশাসনের সংস্কার নিয়ে কড়া জবাবদিহির মুখোমুখি হতে পারে সরকার।
দ্বিতীয় বড় শর্তটি যুক্ত রয়েছে দেশের ভঙ্গুর ব্যাংক খাতের সঙ্গে। খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংক, মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট এবং সুশাসনের অভাব—সব মিলিয়ে ব্যাংক খাত এখনও অর্থনীতির প্রধান ঝুঁকি। জুলাইয়ে বাংলাদেশ সফর শেষে আইএমএফ জানিয়েছিল যে ব্যাংকিং খাতে চাপ এখনও বেশি এবং তা পুনর্গঠনে একটি বিশ্বাসযোগ্য কৌশল প্রয়োজন। এবার তাই কেবল সংস্কারের কাগজকলমে ঘোষণা নয়, বরং বাস্তবে কী অগ্রগতি হয়েছে, তা দেখতে চাইবে সংস্থাটি। দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন এবং পরিচালনা পর্ষদে সুশাসন প্রতিষ্ঠা না হলে এই খাতের মাধ্যমে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।
তৃতীয়ত, সরকারের ব্যয়ের ওপর চাপ কমাতে ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা নতুন ঋণের শর্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের অস্থিরতা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে ভর্তুকির চাপ অনেক বেড়েছে। এরই মধ্যে সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালেও, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম এবং ভর্তুকির পরিমাণ যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার বিষয়ে আইএমএফের সঙ্গে বড় ধরনের দরকষাকষি হতে পারে। এই পদক্ষেপগুলো পরোক্ষভাবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চতুর্থ বড় পরীক্ষাটি হলো সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ এবং ধীর প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এখনও কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রেখেছে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দিতে হবে।
আইএমএফের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকেও নতুন অর্থায়ন পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। বাজেট সহায়তার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য ও সার আমদানি, ব্যাংক খাত পুনর্গঠন এবং জলবায়ু মোকাবিলায় অর্থায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু ঋণ নিয়ে অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতা দূর করা সম্ভব নয়।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এবং সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমানের মতে, ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এবং দেশের নিজস্ব স্বার্থেই রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতে কাঠামোগত সংস্কার আনতে হবে। আগামী অক্টোবরের পর্যালোচনা বৈঠকই মূলত নির্ধারণ করবে নতুন ঋণের দরজা খুলতে গিয়ে বাংলাদেশকে কতখানি কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হয়।
এসএ