দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ৩০ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি হলেও চাহিদার সময় পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না। গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির সংকট, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটি এবং জ্বালানির বাড়তি দামের কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ায় কিছুদিন ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং চলছে। এর প্রভাব পড়ছে রাজধানীর বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে গ্রামীণ কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও খামারে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ১০ সেপ্টেম্বর রাত ৯টায় দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ১২৮ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ৪৩৯ মেগাওয়াট। ফলে ওই সময় ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৬৮৯ মেগাওয়াট। একই দিন দুপুর ৩টায় ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াটে।
অবশ্য সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। ২৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে চাহিদা ছিল ১৩ হাজার ৯৫১ মেগাওয়াট এবং সরবরাহ ১৩ হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট; ঘাটতি ছিল ১৮৩ মেগাওয়াট। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীলতা থাকায় পরিস্থিতি আবারও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
ঢাকায় বিদ্যুৎ গেলেই বাড়ে অন্য সংকট
রাজধানীতে লোডশেডিংয়ের প্রভাব শুধু আলো বা বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারে সীমাবদ্ধ নেই। অনেক বহুতল ভবনে পানির পাম্প বিদ্যুৎনির্ভর হওয়ায় বিদ্যুৎ চলে গেলে পানি সরবরাহও ব্যাহত হয়। লিফট বন্ধ থাকায় বহুতল ভবনের বাসিন্দাদের চলাচলেও সমস্যা হয়।
আগস্টে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নির্ধারিত সময়ের বাইরে একাধিকবার বিদ্যুৎ যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। পাওয়ার গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, ৬ সেপ্টেম্বর রাত ৯টায় ঢাকায় চাহিদা ছিল ৬ হাজার ১৮২ মেগাওয়াট; এর মধ্যে ৭৫৯ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়, যা ওই সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল।
বিদ্যুৎ সংকটের সঙ্গে রাজধানীতে গ্যাস সংকটও যুক্ত হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ না থাকা অবস্থায় বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের খরচও বাড়ছে অনেক পরিবারের।
গ্রামে সংকটের প্রভাব সরাসরি আয়ে
গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব আরও সরাসরি উৎপাদন ও আয়ের ওপর পড়ছে। আগস্টে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছয় থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া যায়। কোথাও কোথাও তা ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছায়। ১২ আগস্ট জাতীয় গ্রিডে সর্বোচ্চ ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ১৯৪ মেগাওয়াট। সেদিন সকাল ৮টায় চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২৪৯ মেগাওয়াট, সরবরাহ ১২ হাজার ৯৩৫ মেগাওয়াট।
রাজশাহীতে শহরাঞ্চলে যেখানে দুই থেকে চার ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া যায়, সেখানে গ্রামাঞ্চলে তা ছয় থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত ছিল। গোপালগঞ্জের কোনো কোনো এলাকায় আট থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার তথ্যও এসেছে।
এর প্রভাব পড়ছে সেচ, পোলট্রি, মৎস্যচাষ, কোল্ড স্টোরেজ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়। বিদ্যুৎনির্ভর যন্ত্র চালাতে না পেরে অনেক ক্ষেত্রে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে।
উৎপাদন সক্ষমতা আছে, জ্বালানি নেই
বিদ্যুৎ সংকটের বড় কারণ উৎপাদন সক্ষমতার ঘাটতি নয়; বরং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ করতে না পারা।
আগস্টে ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কোনো না কোনোভাবে ব্যাহত হয়েছিল। এর মধ্যে ২০টি কেন্দ্র পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ রেখেছিল এবং অন্যগুলো সীমিত সক্ষমতায় চলছিল। গ্যাসের পাশাপাশি কয়লা ও তরল জ্বালানির সংকট এবং কয়েকটি কেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটিও উৎপাদন কমিয়ে দেয়।
একই সময়ে গ্যাস সরবরাহও চাহিদার তুলনায় অনেক কম ছিল। ১৩ আগস্ট দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে, যেখানে চাহিদা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
জ্বালানি সংকট সামাল দিতে বেশি ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে হয়েছে। ৮ আগস্ট ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৯০ কোটি টাকা। কয়েক দিন আগেও এই ব্যয় ছিল প্রায় ৬১ কোটি টাকা। একই সময়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে দৈনিক ব্যয় ছিল প্রায় ৩০–৩৩ কোটি টাকা।
অর্থাৎ, একই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জ্বালানির ধরন বদলালে সরকারের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
বিদ্যুতের দামও বেড়েছে
বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাড়তি খরচ সামাল দিতে চলতি বছরের জুনে বিদ্যুতের খুচরা দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়। প্রতি ইউনিটের গড় খুচরা দাম ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বেড়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা হয়েছে। পাইকারি পর্যায়ে দাম ৭ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা। তবে কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী নিম্নআয়ের আবাসিক গ্রাহকদের জন্য আগের কম হার বহাল রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ ভোক্তার জন্য বিদ্যুতের দাম বাড়লেও সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা এখনও নিশ্চিত হয়নি। ফলে ভোক্তাকে একদিকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ না থাকার সময় বিকল্প ব্যবস্থা করতেও বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে।
সমাধানের পথ কোথায়
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ক্ষেত্রে জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষতা এবং গ্রিডের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
সরকার সেপ্টেম্বরের শুরুতে ব্যাটারি-সংবলিত রুফটপ সোলারের জন্য নতুন প্রণোদনা চালু করেছে। এ ধরনের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সর্বোচ্চ ব্যয় ৮ টাকা প্রতি ইউনিট ধরে অতিরিক্ত মুনাফা ও প্রণোদনা যোগ করে জাতীয় গ্রিডে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে কেনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর্তমানে গড় খুচরা বিদ্যুতের দাম প্রায় ১০ টাকা ৪০ পয়সা।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে বিশেষ করে শিল্প, বাণিজ্যিক ভবন ও বড় আবাসিক ভবনে দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে।
একই সঙ্গে গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, এলএনজি আমদানির উৎস বহুমুখী করা, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহব্যবস্থায় নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো প্রয়োজন।
সরকার আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে।
তবে শুধু নতুন উৎপাদন সক্ষমতা যোগ করলেই সংকটের সমাধান হবে না। বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর জন্য সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি এবং সেই বিদ্যুৎ গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো শক্তিশালী গ্রিড দুটিই নিশ্চিত করতে হবে।
বিদ্যুৎ খাতে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ইতিমধ্যে ব্যয় বাড়িয়েছে। একটি গবেষণা অনুযায়ী, ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ৮৩ শতাংশ বেড়েছে; একই সময়ে প্রাথমিক জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা বেড়ে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।
ফলে বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে সুষম লোড ব্যবস্থাপনা, জরুরি সেবাকে অগ্রাধিকার এবং উৎপাদনক্ষম কেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিশ্চিত করা জরুরি। আর দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ঝুঁকি কমিয়ে সাশ্রয়ী দেশীয় জ্বালানি, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ও কার্যকর ব্যাকআপ সক্ষমতা তৈরি করাই হতে পারে টেকসই সমাধানের ভিত্তি।
শহরের বাসিন্দার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ যেমন পানি ও দৈনন্দিন জীবন সচলের বিষয়, গ্রামাঞ্চলের মানুষের জন্য তা অনেক সময় কৃষি ও আয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান শুধু উৎপাদন বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কত কম খরচে, কত নির্ভরযোগ্যভাবে এবং কোন এলাকায় কী প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ পৌঁছানো যাচ্ছে এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
এসএস