বরগুনার আমতলীতে উন্মুক্ত জলাশয় থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ। খাল-বিল, নদ-নদী ও নালাবেষ্টিত এ জনপদের মুক্ত জলাশয়গুলোতে একসময় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ দেখা গেলেও এখন সে চিত্র ভিন্ন। অতীতে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া গেলেও এখন টিকে আছে মাত্র কয়েক প্রজাতির মাছ।
দেশীয় প্রজাতির মাছ হারিয়ে যাওয়ার কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো স্থানীয় নদ-নদীগুলোর নাব্যতা হ্রাস, খাল-বিল ভরাট করে রাস্তাঘাট ও বাড়িঘর নির্মাণ, খাল ইজারা দেওয়া, কচুরিপানা, মাছের আবাসস্থলের পার্শ্ববর্তী জমিতে কীটনাশকের ব্যবহার, অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ নির্মাণ করে মাছ চলাচলে বাধা সৃষ্টি ও প্রজননক্ষেত্র বিনষ্ট, অপরিকল্পিতভাবে পানি নিষ্কাশন, ডিমওয়ালা মাছ নিধন, কারেন্ট জাল, চায়না জাল ও নেটের ব্যবহার ইত্যাদি।
এ ছাড়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানে জাল দিয়ে বিভিন্ন প্রজাতির মা মাছ এবং মাছের রেণু-পোনা নির্বিচারে ধরার কারণে মাছের বংশবৃদ্ধি হচ্ছে না। বিশেষ করে উন্মুক্ত জলাশয়ে কৈ, শোল, বোয়াল, মাগুর, শিং, ফলি, পুঁটি, চিংড়ি, পাবদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। বর্ষার সময় গ্রামের মানুষ একত্রে মিলে পানি সেচ দিয়ে, আবার কখনো জাল দিয়ে এবং চাঁই ও বুচনা পেতে মাছ শিকার করতেন। খলই, পাতিল কিংবা ব্যাগে করে মাছ নিয়ে সবাই যখন বাড়ি ফিরতেন, তখন বাড়ির নারীরা সে দৃশ্য দেখে খুশি হতেন।
তবে মাছ শিকারের জন্য এসব উপকরণ বর্তমানে থাকলেও নদী-নালা, খাল-বিল কিংবা উন্মুক্ত জলাশয়ে আগের মতো এখন আর এসব মাছের দেখা মেলে না।
বর্তমানে বিলুপ্তির পথে থাকা এসব মাছ এখন আর উপজেলার হাট-বাজারে তেমন একটা দেখা যায় না। হাতে গোনা কয়েক প্রজাতির মাছ দেখা গেলেও মূলত বিদেশি প্রজাতির মাছ এখন হাট-বাজার দখল করে রেখেছে। তবে কিছু অসাধু জেলে নদী কিংবা খালে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কীটনাশক প্রয়োগ করে মাছের বংশবিস্তার নষ্ট করছে। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন মৎস্য খামারের মাছেও বাজার সয়লাব হয়ে গেছে।
জেলেরা জানান, ফসলি জমিতে অতিমাত্রায় কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মাছের প্রজননক্ষমতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। মা মাছগুলো যখন ডিম ছাড়ে, তখন পোনা মাছগুলো কীটনাশকের কারণে মারা যায়।
এর ফলে মাছের যেভাবে বংশবিস্তার হওয়ার কথা, তা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এ কারণে উন্মুক্ত জলাশয়গুলো মাছশূন্য হয়ে পড়ায় এখন সবাই পুকুরে হাইব্রিড জাতের মাছ চাষের দিকে ঝুঁকেছেন। তাছাড়া আমাদের প্রয়োজনীয় মাছের চাহিদা মেটাতে হচ্ছে চাষকৃত মাছ থেকেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কৃষি ও চাষাবাদ ব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উজাড় হয়ে যাচ্ছে দেশি প্রজাতির কৈ, মাগুর, শিং, টেংরা, পুঁটি, মলা, ঢেলা, চেলা, শোল, বোয়াল, আইড়, ভ্যাদা, বাইম, খলিসা, ফলি, চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির মিঠাপানির মাছ। গ্রামে একসময় অগ্রহায়ণ, পৌষ ও মাঘ মাসে পুকুর, খাল, ডোবা ও ঘেরের পানি কমতে থাকলে দেশি মাছ ধরার ধুম পড়ে যেত। অথচ এখন অনেক গ্রামেই দেশি প্রজাতির মাছ নেই বললেই চলে। শীতকালের বাইরে বর্ষাকালে ধানের জমিতে কইয়া জাল, বড়শি ও চাঁই পেতে মাছ ধরার রীতিও অনেক এলাকা থেকে হারিয়ে গেছে। যারা একসময় পুকুর, খাল-বিল, ডোবা ও নালায় মাছ ধরে পরিবারের চাহিদা পূরণ করতেন, তাদের অনেকেই এখন বাজার থেকে মাছ কিনে খেতে বাধ্য হচ্ছেন।
আমতলীর মাছ বাজারের ব্যবসায়ী সোহেল রানা বলেন, ‘স্থানীয় বাজারগুলোতে হাটের দিন দেশি প্রজাতির অনেক মাছ উঠত। এখন আর সেসব মাছ তেমন ওঠে না। বাজার ভরা থাকে চাষের পাঙ্গাস আর তেলাপিয়ায়।’ দেশি মাছ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি ইরি ধান ও অন্যান্য সবজিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহারকে দায়ী করেন।
আমতলী উপজেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, দেশে মোট জনসংখ্যার তুলনায় বর্তমানে মাছের চাহিদা রয়েছে ৫ হাজার ১৩৭ মেট্রিক টন। এর মধ্যে উন্মুক্ত জলাশয় থেকে উৎপাদন হয় ৩ হাজার ৮৫ মেট্রিক টন। বাকি চাহিদা চাষকৃত মাছ থেকে পূরণ করা হয়।
আমতলী উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা তন্ময় কুমার দাস বলেন, ‘মৎস্য বিভাগ থেকে দেশীয় মৎস্যসম্পদ রক্ষার চেষ্টা করা হচ্ছে। জনসাধারণের সচেতনতা ও মৎস্যসম্পদ আইন মেনে যদি মাছ ধরা হয়, তাহলে দেশীয় প্রজাতির মাছ রক্ষা করা সম্ভব হবে।’
এসকে/আরএন