মৌলভীবাজারে হবিগঞ্জের বাস আটক, গাড়ি ভাঙচুর ও পরিবহন শ্রমিকদের মারধরের প্রতিবাদে হবিগঞ্জে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সকাল থেকে হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের ডাকে এ ধর্মঘট শুরু হয়। এতে জেলার অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার সব ধরনের গণপরিবহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।
ধর্মঘটের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নারী, শিশু, বয়স্ক ও গুরুতর অসুস্থ রোগীরা। বিশেষ করে জরুরি প্রয়োজনে সিলেটসহ বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতে বের হওয়া যাত্রীরা পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে।
বৃহস্পতিবার সকালে সরেজমিনে হবিগঞ্জ শহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ধর্মঘটের কারণে সারি সারি বাস দাঁড়িয়ে রয়েছে। বন্ধ রয়েছে বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ম্যাক্সিসহ বিভিন্ন ধরনের গণপরিবহন। যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছেন অনেক যাত্রী। কেউ কেউ বিকল্প ছোট যানবাহনে করে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, আবার অনেকে বাধ্য হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন।
জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা যাত্রীরা পড়েছেন সবচেয়ে বেশি বিপাকে। ছোট ছোট যানবাহনে ভেঙে ভেঙে জেলা শহরে এলেও গন্তব্যে পৌঁছানোর কোনো নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না তারা।
ভুক্তভোগী যাত্রীরা জানান, কয়েক দিন পরপর পরিবহন ধর্মঘটের কারণে তাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের বিরোধের কারণে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাখা হচ্ছে। তারা এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি জানান।
করিম উল্লাহ নামের এক যাত্রী বলেন, “সিলেটের একটি হাসপাতালে আমার ভাই ভর্তি রয়েছেন। তার কাছে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়েছি। কিন্তু বাসস্ট্যান্ডে এসে দেখি কোনো বাস চলছে না। এখন কীভাবে সিলেট যাব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছি।”
হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক আবু মঈন চৌধুরী সোহেল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের বিরতিহীন এক্সপ্রেস বাসের চালক ও শ্রমিকদের মৌলভীবাজারের এসএমএস পরিবহনের মালিক ও শ্রমিকরা শেরপুরে আটক করে গাড়ি ভাঙচুর এবং মারধর করে আসছেন। সর্বশেষ আমাদের তিনটি গাড়ি তাদের কার্যালয়ের সামনে নিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। এ নিয়ে একাধিকবার বৈঠক হলেও তারা কোনো সিদ্ধান্ত মানছেন না। বাধ্য হয়েই আমরা ধর্মঘটের ডাক দিয়েছি। জেলার কোনো সড়কেই কোনো ধরনের গণপরিবহন চলাচল করবে না। বিরোধের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে।
জানা গেছে, হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের সঙ্গে মৌলভীবাজারের এসএমএস পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। মৌলভীবাজারের পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের বিরুদ্ধে হবিগঞ্জের বাস চলাচলে বাধা, শ্রমিকদের মারধর ও গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, হবিগঞ্জের ওপর দিয়ে মৌলভীবাজারের বাস চলাচলেও বিভিন্ন সময় বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিলে হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের মালিক ও শ্রমিকরা শায়েস্তাগঞ্জে অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলে তারা অবরোধ প্রত্যাহার করেন।
গত ১২ জুন সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গউছ এমপির নেতৃত্বে পাঁচজন সংসদ সদস্য ও প্রশাসনের বিভাগীয় কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে বিরোধ নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে তা কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
গত ১১ সেপ্টেম্বর এবং সর্বশেষ ২৪ সেপ্টেম্বর সিলেট থেকে মৌলভীবাজারে পৌঁছালে হবিগঞ্জের বিরতিহীন এক্সপ্রেসের তিনটি বাস আটক করা হয় বলে অভিযোগ করেছে হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপ। এর প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও বাস মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম রিপন। তিনি জানান, তারা বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের নেতৃবৃন্দের লোকজন শ্রীমঙ্গলে তাদের এসএমএস পরিবহনের কাউন্টারে হামলা ও ভাঙচুর করেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজন শ্রমিক হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন, যাদের মধ্যে একজন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। তার দাবি, শ্রীমঙ্গলের শ্রমিকরাই বাস আটকে রেখেছেন এবং এ ঘটনায় থানায় মামলাও হয়েছে।
আব্দুর রহিম রিপন বলেন, বিষয়টি সমাধান করতে হলে উভয় পক্ষকে নিয়ে আলোচনায় বসতে হবে।
দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও পরিবহন ধর্মঘটের কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে হবিগঞ্জের সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা। দ্রুত এ বিরোধের স্থায়ী সমাধান না হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এসএ