পোল্ট্রি মাংসের পুষ্টিগুন বৃদ্ধিতে প্ল্যানটেইন গবেষণায় সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) এনিমেল নিউট্রিশন বিভাগ। প্রায় দুই দশকের ধারাবাহিক গবেষণার মাধ্যমে ঔষধি উদ্ভিদ প্ল্যানটেইনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে নিরাপদ ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ব্রয়লার মাংস উৎপাদনের একটি সমন্বিত প্রযুক্তি ও ভ্যালু চেইন উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোহাম্মদ আল-মামুন।
রোববার প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আয়োজিত এক কর্মশালায় এ তথ্য উপস্থাপন করেন।
প্রকল্প পরিচালক তার মূল প্রবন্ধে বলেন, গবেষণাটির সূচনা জাপানে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশে ধারাবাহিক গবেষণার মাধ্যমে এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফাইটোজেনিক বৈশিষ্ট্য, ব্রয়লারের উৎপাদন দক্ষতা এবং মাংসের কার্যকরী পুষ্টিগুণের উপর প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়েছে। এ গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ দেশ-বিদেশে বিভিন্ন পুরষ্কার ও সম্মাননা অর্জিত হয়েছে।
৩য় পর্যায়ের প্রকল্পে প্ল্যানটেইন-ভিত্তিক ফাইটোজেনিক ফিড প্রযুক্তির কার্যকারিতা সফলভাবে প্রদর্শিত হওয়ার পর বর্তমান ৫ম পর্যায়ের প্রকল্প "Sustainable commercialization of plantain (Plantago lanceolata L.) and seed value chain development for safe and functional broiler meat production"-এ মূল গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রযুক্তিটিকে বাংলাদেশে টেকসই ও বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণের উপর।
প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য অর্জন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমদানিকৃত প্যারেন্টাল বীজ থেকে বাংলাদেশে এ। এবং পরবর্তীতে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের জন্য জি-২ বীজ সফলভাবে উৎপাদন করা হয়েছে। পরীক্ষায় জি-২ বীজ উৎপাদন বিশেষ সম্ভাবনাময় হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। এব ফলে ভবিষ্যতে আমদানিকৃত বীজের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় প্ল্যানটেইন বীজ শিল্প গড়ে তোলার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।
এসি ও নন-এসি গ্রিনহাউসের পাশাপাশি ময়মনসিংহ ও মানিকগঞ্জে উন্মুক্ত মাঠে প্লানটেইন চাষ করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ের ফলাফল বাণিজ্যিকভাবে প্ল্যানটেইন উৎপাদনের বাস্তব সম্ভাবনা নির্দেশ করেছে। বীজ উৎপাদন থেকে শুরু করে চাষ, সংগ্রহ, শুকানো ও গুঁড়া প্রস্তুত পর্যন্ত একটি সম্ভাব্য দেশীয় কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
প্লানটেইনকে প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে অন্যান্য নির্বাচিত। ঔষধি উদ্ভিদের সমন্বয়ে প্লান্টিভ একটি ফাইটোজেনিক ফিড অ্যাডিটিভ প্রযুক্তি উন্নয়ন করা হয়েছে। বর্তমান প্রকল্পে দুটি ব্রয়লার ও একটি দেশি মুরগির পরীক্ষাসহ ধারাবাহিক গবেষণায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত প্ল্যানটেইন ব্যবহারেও সন্তোষজনক উৎপাদন ফলাফল পাওয়া গেছে। পাশাপাশি মাংসে পিইউএফএ, বিশেষ করে ওমেগা ৩, ফ্যাটি এসিড, এইচডিএল এবং আয়রন (Fe) সঞ্চয়ের ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা হয়েছে। প্রচলিত ব্রয়লার মাংসের তুলনায় BAU-Plantive ব্যবহারে উৎপাদিত মাংসে অধিক আকর্ষণীয় ও কাঙ্ক্ষিত লালচে বর্ণ এবং উন্নত স্বাদ পাওয়া গেছে। এসব বৈশিষ্ট্য ব্যবহারে পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ, দৃষ্টিনন্দন ও ভোক্তার কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য পোলট্রি মাংস উৎপাদনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
মূল প্রবন্ধে তিনি আরো বলেন, প্রযুক্তিটি শুধু গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ না রেখে মানিকগঞ্জে বাণিজ্যিক খামার পর্যায়ে কার্যকরী ব্রয়লার উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকার বাজার ও সুপারশপের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। বাজার-সংযোগ কার্যক্রমে বৃহৎ পরিসরে বিপণনের জন্য প্রসেসিং, ব্লাস্ট ফ্রিজিত কোল্ড-চেইন সুবিধার প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিত হয়েছে।
তিনি তার প্রবন্ধে আরো বলেন, দেশেই এই প্লান্টিন উৎপাদনের জন্য জি টু বীজের বৃহৎ পরিসরে গুণগ মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন, বীজ কোম্পানির সম্পৃক্ততা, চুক্তিভিত্তিক প্ল্যানটেইন চাষ, ফিড মিলের মাধ্যমে উৎপাদন ও ব্যবহার, নির্বাচিত খামারে কার্যকরী ব্রয়লার উৎপাদন এবং উপযুক্ত প্রসেসিং ও কোল চেইনের মাধ্যমে বাজারজাতকরণ।
সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বীজ কোম্পানি, ফিড মিল, পোল্ট্রি শিল্প, এনজিও এবং বাজার ব্যবস্থাপনার সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে এই দেশীয় উদ্ভিদভিত্তিক প্রযুক্তি নিরাপদ ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ পোল্ট্রি উৎপাদনের পাশাপাশি নতুন বীজ ফিড-অ্যাডিটিভ শিল্প, কৃষকের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।
কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ এ্যকাডেমি অব সাইন্সেস (বিএএস) এর প্রেসিডেন্ট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষণাকে সাদুবাদ জানিয়ে এই প্লাণ্টেইনের চাষাবাদ, ব্যবহার এবং প্রচণে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
কর্মশালায় বিভিন্ন কৃষিবিশ্ববিদ্যালয়, প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞ, বেসরকারি উদ্যোক্তারা উপস্থিত ছিলেন।
টিআইএস