দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকা রোহিঙ্গাদের জন্য একটি স্থায়ী ও টেকসই সমাধানের পথ তৈরির তাগিদ দিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের মতো উপযুক্ত পরিবেশ মিয়ানমারে এখনও তৈরি হয়নি। তবে কেবল কোনোরকমে বেঁচে থাকা নয়, তাদের একটি মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাইডলাইনে বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দ ও জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা।
অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) বারহাম সালেহ জানান, বাংলাদেশে এখনও প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছেন। মিয়ানমারে নিরবচ্ছিন্ন সংঘাতের কারণে প্রত্যাবাসনের সুযোগ তৈরি না হওয়ায় একটি পুরো প্রজন্ম নির্বাসনে বড় হচ্ছে। ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে সামরিক বাহিনীর নির্বিচার অভিযানের পর লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে, যারা আজও মানবিক আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
দীর্ঘস্থায়ী এই বাস্তুচ্যুতির কারণে মানবিক সংকটের গভীরতা তুলে ধরেন মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত জুলি বিশপ। তিনি জানান, ২০১৭ সালে জন্ম নেওয়া শিশুদের পুরো শৈশবই কেটেছে শরণার্থী শিবিরের গণ্ডিতে। প্রতিবছর গড়ে ৩০ হাজারের বেশি শিশু এসব শিবিরে জন্মগ্রহণ করছে। একই সঙ্গে পরিবারগুলোতে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, সশস্ত্র ও অপরাধী চক্রের ভয়াল থাবা এবং শিক্ষা ও সুরক্ষা সেবার সুযোগ কমে যাওয়ায় তরুণ সমাজ চরম হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে।
জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা দীর্ঘ সময় ধরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তবে তারা সতর্ক করে বলেন, এই বিশাল মানবিক সংকটের বোঝা এককভাবে বাংলাদেশের ওপর ছেড়ে দেওয়া অনুচিত।
ইউএনএইচসিআর প্রধান উল্লেখ করেন, তহবিল বা আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে গেলেও মানবিক চাহিদা কমে যায় না। সাহায্য কমে গেলে খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার ওপর চাপ বাড়ে, যার ফলে ভুক্তভোগীরা মানবপাচার, অসাধু চক্রের শোষণ কিংবা বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রার মতো ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়।
সভায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সংকটের সার্বিক নিরাপত্তা ও মানবিক চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে বলেন, "দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা নতুন জটিলতা তৈরি করছে। এর ফলে মানবপাচার, মাদক পাচার ও নানা ধরনের আন্তঃদেশীয় অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে।" আন্তর্জাতিক সহায়তার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি জোর দিয়ে বলেন, মানবিক সহায়তা কখনো রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প হতে পারে না। বাংলাদেশ অনির্দিষ্টকালের জন্য এই বোঝা বহন করবে—এমনটা প্রত্যাশা করা যায় না। কারণ এই সংকটের সূচনা মিয়ানমারে, আর এর সমাধানও লুকিয়ে আছে মিয়ানমারেই।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমান মিয়ানমারের রাখাইনসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অব্যাহত সহিংসতা, বেসামরিক নাগরিকদের ওপর বিমান হামলা, নির্যাতন ও গুমের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক এজেন্ডায় বাঁচিয়ে রাখতে রাজনৈতিক মনোযোগ বজায় রাখা জরুরি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গাম্বিয়ার দায়ের করা গণহত্যা মামলার প্রসঙ্গ টেনে কর্মকর্তারা বলেন, যেকোনো স্থায়ী সমাধানের মূলে থাকতে হবে ন্যায়বিচার ও অপরাধীদের জবাবদিহিতা।
ইউএনএইচসিআর প্রধান বারহাম সালেহ স্মরণ করিয়ে দেন, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বললে জানা যায় তারা সবাই নিজ ভিটেমাটিতে ফিরতে চান। তবে এই ফেরা মানে শুধুই সীমান্ত পার হওয়া নয়; এর অর্থ হলো নাগরিকত্বের অধিকার, স্বাধীনভাবে চলাফেরা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং ভয়হীন জীবনের সুযোগ পাওয়া। সেই মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করাই এখন বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রধান দায়িত্ব।
এসএ