যুক্তরাজ্যের ১ লাখ ১৩ হাজার ৭০০-এর বেশি নারীর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যতথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, স্তন ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত জীবনযাপনগত ঝুঁকি বয়স ও জীবনের পর্যায়ভেদে পরিবর্তিত হয়। বিশেষ করে ৩০ থেকে ৫০ বছর বয়সে শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং মদ্যপান কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন ও ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষকরা স্তন ক্যানসার নিয়ে পরিচালিত দীর্ঘমেয়াদি একটি গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ ফল পেয়েছেন। গবেষণাটি ‘বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের বয়স ছিল ১৬ থেকে ১০২ বছর। ২০০৩ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে তাদের গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে মদ্যপান, ধূমপান, শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং শরীরের ওজন কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করেন গবেষকরা।
গবেষণায় দেখা যায়, মদ্যপান, ধূমপান ও শারীরিক কর্মকাণ্ডের মাত্রা সাধারণত কৈশোরের শেষ দিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। অন্যদিকে বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরে অতিরিক্ত চর্বির পরিমাণও বাড়তে থাকে এবং ষাটের দশকের শেষ দিকে তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
গবেষকদের মতে, জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে এসব পরিবর্তন চিহ্নিত করা গেলে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে বয়সভিত্তিক প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। কৈশোর ও প্রাথমিক যৌবনে শারীরিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো এবং দ্রুত ওজন বৃদ্ধি ঠেকানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। আর ৩০ থেকে ৫০ বছর বয়সে শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ ও মদ্যপান কমানো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের ক্যানসার মহামারি ও প্রতিরোধ বিভাগের অধ্যাপক মার্ক গুন্টার বলেন, জীবনের কোন পর্যায়ে মানুষের আচরণ ও জীবনযাপনগত অভ্যাসে বড় পরিবর্তন ঘটে তা চিহ্নিত করা গেলে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে আরও লক্ষ্যভিত্তিক জনস্বাস্থ্য কৌশল নেওয়া সম্ভব হবে।
গবেষণায় প্রজন্মভেদেও পার্থক্য পাওয়া গেছে। ১৯৬০ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া নারীদের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে শরীরের ওজন আগের প্রজন্মের তুলনায় বেশি ছিল। একই সঙ্গে তাদের মদ্যপান ও ধূমপানের মাত্রা আগের প্রজন্মের তুলনায় কম বয়সেই সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
গবেষকদের মতে, গবেষণাটির অন্যতম গুরুত্ব হলো এটি কোনো নির্দিষ্ট বয়সের নারীদের নিয়ে করা এককালীন জরিপ নয়। বরং একই গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ঝুঁকিসংশ্লিষ্ট আচরণ কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তা দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
স্তন ক্যানসার নিয়ে কাজ করা একটি দাতব্য সংস্থার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সাইমন ভিনসেন্ট বলেন, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং মদ্যপান কমানোর মতো জীবনযাপনগত পরিবর্তন স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। সংস্থাটির হিসাবে, এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে অন্তত ২৩ শতাংশ স্তন ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে।
ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটের দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার প্রধান অ্যামি বেরিংটন বলেন, এসব জীবনযাপনগত কারণ শুধু স্তন ক্যানসারের সঙ্গেই সম্পর্কিত নয়; ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ ও অন্যান্য ক্যানসারসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের সঙ্গেও এগুলোর সম্পর্ক রয়েছে।
যুক্তরাজ্যে প্রতিবছর নারীদের মধ্যে প্রায় ৫৯ হাজার নতুন স্তন ক্যানসারের ঘটনা শনাক্ত হয়। পুরুষদের মধ্যেও বছরে প্রায় ৪২০টি নতুন স্তন ক্যানসারের ঘটনা শনাক্ত হয়।
তবে গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন, গবেষণাটি কোনো নির্দিষ্ট বয়সে স্তন ক্যানসার হওয়ার সরাসরি কারণ নির্ধারণ করেনি। বরং জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবর্তনযোগ্য জীবনযাপনগত ঝুঁকিগুলো কীভাবে বদলায় এবং কোন বয়সে কী ধরনের প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে।
এফএস