কখনো কি এমন হয়েছে- পুরোনো কোনো কার্টুনের গান হঠাৎ কানে আসতেই আপনি থমকে গেছেন?
কয়েক সেকেন্ডের জন্য চারপাশের পৃথিবীটা যেন একটু ঝাপসা হয়ে গেছে। মনে হয়েছে, আপনি আর আজকের মানুষটি নন। আপনি ফিরে গেছেন সেই ছোট্ট ঘরটিতে। সামনে পুরোনো টেলিভিশন। স্কুল থেকে ফিরে ব্যাগটা এক পাশে ছুড়ে রাখা। পাশে হয়তো ভাই-বোন, মা কিংবা বাবা। আর চোখ আটকে আছে পর্দায়- প্রিয় কার্টুনের চরিত্রটির দিকে।
তখন পৃথিবীটা খুব ছোট ছিল। কিন্তু সেই ছোট পৃথিবীতেই আনন্দের অভাব ছিল না।
একটি কার্টুনের নতুন পর্ব মানেই ছিল উৎসব। ছুটির দিন মানেই একটু বেশি সময় টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা। খাওয়ার কথা ভুলে যাওয়া, পড়ার কথা ভুলে যাওয়া- শুধু গল্পের ভেতর ডুবে থাকা।
তারপর একদিন আমরা বড় হয়ে গেলাম। টেলিভিশনের সামনে বসার সময় কমে গেল। জায়গা নিল পড়াশোনা, চাকরি, সংসার, অর্থনীতি, সম্পর্ক, ভবিষ্যৎ আর অসংখ্য দায়িত্ব। যে পৃথিবীতে একসময় একটি কার্টুন চরিত্রই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে এখন বাস্তব জীবনের চিন্তাগুলো একে একে দরজায় কড়া নাড়ে। তবু কার্টুন হারিয়ে যায় না।
কখনো কোনো পুরোনো দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখে পড়ে। কখনো ইউটিউবের কোনো ভিডিওতে ভেসে আসে পরিচিত সেই গান। আর আশ্চর্যজনকভাবে, মনটা কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ফিরে যায় বহু বছর আগের এক দুপুরে। কার্টুন তখন আর শুধু কার্টুন থাকে না। ওটা হয়ে ওঠে স্মৃতির দরজা।
পর্দার ওপারে আসলে যে সময়টা ছিল
আমরা ভাবি, আমরা পুরোনো কার্টুন দেখতে বসেছি। আসলে হয়তো আমরা কার্টুন দেখতে বসিনি। আমরা ফিরে গেছি এমন একটি সময়ে, যখন জীবন এত জটিল ছিল না।
স্মৃতি বড় অদ্ভুত জিনিস। সে শুধু ঘটনা মনে রাখে না। মনে রাখে সেই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষ, ঘর, গন্ধ, শব্দ, আলো এবং অনুভূতিও।
তাই বহু বছর পর কোনো পরিচিত কার্টুনের চরিত্র চোখে পড়লে শুধু চরিত্রটিকেই মনে পড়ে না। মনে পড়ে সেই মানুষগুলোকে, যারা তখন পাশে বসে ছিল। মনে পড়ে সেই ঘরটাকে। মনে পড়ে স্কুল থেকে ফেরার দুপুর। মনে পড়ে ছুটির দিনের অলসতা।
এমনকি মনে পড়ে যায় জীবনের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তাটিও- ‘পরের পর্বটা কখন শুরু হবে?’
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এর সঙ্গে নস্টালজিয়ার সম্পর্ক রয়েছে। অতীতের কোনো সুখকর স্মৃতি যখন বর্তমানের কোনো দৃশ্য, শব্দ বা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জেগে ওঠে, তখন আমাদের মনে তৈরি হয় এক ধরনের আবেগময় সংযোগ। কার্টুনের সঙ্গে শৈশবের সম্পর্ক এত গভীর হওয়ার কারণও সম্ভবত এখানেই।
বড়দেরও একটু পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করেপ্রাপ্তবয়স্ক জীবন সবসময় খুব কোমল নয়। সকালে ঘুম থেকে উঠে অফিসের তাড়া। যানজট। কাজের চাপ। মাস শেষে হিসাব। সংসারের দায়িত্ব। সম্পর্কের টানাপোড়েন। ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা।
দিন শেষে মানুষ ক্লান্ত হয়-শুধু শরীরে নয়, মনেও। সেই ক্লান্তির মধ্যে প্রিয় কোনো কার্টুনের একটি পর্ব কখনো কখনো অদ্ভুত এক বিরতি এনে দিতে পারে। কয়েক মিনিটের জন্য বাস্তব পৃথিবীটাকে পাশে রেখে অন্য একটি গল্পে ঢুকে পড়া যায়। হাসা যায়। অবাক হওয়া যায়। এমনকি কোনো কারণ ছাড়াই মন ভালো হয়ে যেতে পারে।
কিছু গবেষণায় অ্যানিমেটেড সিটকম দেখার সঙ্গে বিনোদন ও রিল্যাক্সেশনের মতো কারণের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। নস্টালজিয়া নিয়েও গবেষণায় দেখা গেছে, অতীতের ইতিবাচক স্মৃতির সঙ্গে সংযোগ মানুষের আবেগ ও সৃজনশীল অভিজ্ঞতায় ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে কার্টুনকে মানসিক সমস্যার চিকিৎসা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। এটি বরং অনেকের জন্য হতে পারে বিনোদনের একটি সহজ মাধ্যম- কিছুক্ষণের জন্য নিজের ভেতরের ক্লান্ত মানুষটিকে একটু বিশ্রাম দেওয়ার উপায়।
কার্টুন দেখলে কি আমরা আবার শিশু হয়ে যাই?না। বড় হয়ে কার্টুন ভালো লাগা মানে মানসিকভাবে অপরিণত হয়ে যাওয়া নয়।
মানুষের পছন্দের কোনো বয়সসীমা নেই। কেউ পুরোনো গান শোনেন, কেউ পুরোনো সিনেমা দেখেন, কেউ পুরোনো বই পড়েন। কেউ আবার ফিরে যান শৈশবের কার্টুনের কাছে।
কারণ এসবের মধ্যে মানুষ শুধু বিনোদন খোঁজে না। খোঁজে পরিচিতি। খোঁজে নিরাপত্তা। খোঁজে এমন একটি অনুভূতি, যার সঙ্গে তার জীবনের একটি সুন্দর সময় জড়িয়ে আছে।
২০২০ সালে প্রকাশিত একটি হাঙ্গেরীয় গবেষণাতেও প্রাপ্তবয়স্কদের অ্যানিমেটেড সিটকম দেখার কারণ হিসেবে বিনোদন, সামাজিক ব্যঙ্গ এবং মানসিক স্বস্তির মতো বিষয় উঠে এসেছে।
অর্থাৎ রাতের খাবার শেষে কেউ যদি পুরোনো কার্টুনের একটি পর্ব চালিয়ে দেন, সেটি হয়তো শৈশবে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা নয়। হতে পারে, সারাদিনের ব্যস্ততার পর নিজের জন্য রাখা কয়েক মিনিটের একটি ছোট্ট ছুটি।
কল্পনার সেই দরজাশৈশবে কার্টুনের পৃথিবী ছিল সীমাহীন। সেখানে প্রাণীরা কথা বলত। মানুষ উড়ত। অসম্ভব সব ঘটনা ঘটত। বাস্তবতার নিয়ম সেখানে সবসময় কার্যকর ছিল না। আর আমরা বিশ্বাস করতাম।
হয়তো সেই বিশ্বাসই ছিল শৈশবের সবচেয়ে সুন্দর জিনিসগুলোর একটি। কার্টুন দেখলেই যে কল্পনাশক্তি বাড়ে, এমন সরল সিদ্ধান্তে অবশ্য পৌঁছানো যায় না। কী দেখা হচ্ছে এবং দর্শক সেটিকে কীভাবে গ্রহণ করছেন- সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে কোনো গল্প যদি আমাদের মনে গভীর ছাপ ফেলে, তাহলে সেটি পর্দা বন্ধ হওয়ার পরও আমাদের ভেতরে বেঁচে থাকতে পারে। আমরা চরিত্রগুলো নিয়ে ভাবি। গল্পের অন্যরকম সমাপ্তি কল্পনা করি। নিজেদের জীবনের সঙ্গে মিল খুঁজি।
একটি ভালো গল্প কখনো কখনো শেষ হয় না। পর্দায় শেষ হওয়ার পরও তার কিছুটা থেকে যায় মনের ভেতর।
প্রিয় চরিত্রটি কখনো কখনো আমাদেরই মতোশৈশবে আমরা কার্টুনের চরিত্রগুলোকে শুধু দেখি না- তাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করি। তাদের সাফল্যে আনন্দ পাই। বিপদে চিন্তিত হই। তাদের ভুলে হাসি। কখনো তাদের মতো হতে চাই।
বড় হয়ে সেই সম্পর্কের অর্থ বদলে যায়। কোনো চরিত্রের লড়াই হয়তো তখন আর নিছক গল্প মনে হয় না। তার ব্যর্থতা, আবার উঠে দাঁড়ানো কিংবা কোনো সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার দৃশ্যের মধ্যে নিজের জীবনের ছায়া দেখতে পাই। কার্টুন বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান করে না। কিন্তু কখনো কখনো বাস্তবতার ভারটা কিছুক্ষণের জন্য হালকা করে দেয়।
শেষ পর্যন্ত কার্টুন নয়, আমরা ফিরে যাই নিজের কাছেসম্ভবত বড় হয়ে কার্টুন দেখতে ইচ্ছে করার সবচেয়ে সুন্দর ব্যাখ্যাটি এখানেই। আমরা আসলে কার্টুনের কাছে ফিরি না। ফিরি নিজের কাছে। সেই নিজের কাছে, যে একসময় খুব সহজে হাসতে পারত। অল্পতেই আনন্দ পেত। একটি গল্পের চরিত্রকে বন্ধু ভাবত। একটি গান শুনে উত্তেজিত হয়ে উঠত। ছুটির দিনের দুপুরকে মনে করত অসীম দীর্ঘ।
জীবন আমাদের সেই মানুষটিকে অনেক দূরে সরিয়ে দেয়। দায়িত্বের স্তর জমতে জমতে আমরা ভুলে যাই- আমাদের ভেতরেও একজন মানুষ আছে, যে কখনো শুধু আনন্দ করতে চায়। কোনো কারণ ছাড়া হাসতে চায়। কিছু সময়ের জন্য হিসাবহীন থাকতে চায়।
তাই বয়স ৩০ হোক, ৪০ হোক কিংবা তারও বেশি- পুরোনো কার্টুন দেখে যদি আপনার মন ভালো হয়ে যায়, লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। হয়তো আপনি শিশুসুলভ হয়ে যাচ্ছেন না।
হয়তো আপনার মস্তিষ্ক বহু বছর আগের একটি দরজা খুলে দিয়েছে। দরজার ওপাশে হয়তো এখনো সেই পুরোনো ঘরটি আছে। টেলিভিশনের আলো জ্বলছে। পাশে বসে আছে পরিচিত মানুষগুলো। পর্দায় চলছে আপনার প্রিয় কার্টুন।
আর সেখানে, পৃথিবীর সব দায়িত্বের বাইরে, এখনো বসে আছে আপনার ছোটবেলার সেই মানুষটি- যার সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল, পরের পর্বটা যেন মিস না হয়ে যায়।
-টিএস