রাতে ঘুমানোর সময় পাশের মানুষটির নাক ডাকার শব্দকে অনেকেই নিছক বিরক্তিকর বিষয় হিসেবে দেখেন। কিন্তু নিয়মিত সেই শব্দে ঘুম ভেঙে গেলে বিষয়টি শুধু বিরক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বারবার ঘুম ভাঙা, পর্যাপ্ত গভীর ঘুম না হওয়া এবং পরদিন ক্লান্তি সব মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদে দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব পড়তে পারে।
ঘুমের সময় গলা ও ওপরের শ্বাসনালির নরম টিস্যুতে কম্পন তৈরি হলে সাধারণত নাক ডাকার শব্দ হয়। যুক্তরাজ্যের ব্রিটিশ স্নোরিং অ্যান্ড স্লিপ অ্যাপনিয়া অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ৪০ শতাংশ নাক ডাকেন। পুরুষদের মধ্যে এই সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
বারবার ঘুম ভাঙলে কী হয়?
একজন মানুষ ঘুমের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে কয়েকবার চক্রাকারে যায়। গভীর ঘুমের পর্যায়গুলো শরীর ও মস্তিষ্কের পুনরুদ্ধারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পাশের মানুষের নাক ডাকার কারণে বারবার ঘুম ভেঙে গেলে এই স্বাভাবিক ঘুমের ধারাবাহিকতা নষ্ট হতে পারে।
ফলে সকালে পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পরও ক্লান্ত বা ঝিমঝিম লাগতে পারে। শুধু তাই নয়, ঘুমের ব্যাঘাত মনোযোগ, স্মৃতি এবং দিনের কাজের সক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ঘুম মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় নিয়মিত ঘুমের ঘাটতি হলে এসব ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।
মেজাজ খিটখিটে হওয়ার কারণও হতে পারে
ঘুম ঠিকমতো না হলে শুধু শরীর নয়, মেজাজেও তার প্রভাব পড়ে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পাওয়ার কারণে মানুষ বেশি বিরক্ত বা খিটখিটে হয়ে উঠতে পারেন। চাপ সামলানোও কঠিন মনে হতে পারে। এই পরিস্থিতি দাম্পত্য সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। নাক ডাকার কারণে একজন সঙ্গী যদি নিয়মিত অন্য ঘরে গিয়ে ঘুমাতে বাধ্য হন, তাহলে একই সঙ্গে ঘুমের সমস্যা ও সম্পর্কের দূরত্ব দুই ধরনের পরিস্থিতিই তৈরি হতে পারে।
সব নাক ডাকাই কি সাধারণ সমস্যা?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো নাক ডাকার কারণ খুঁজে দেখা। সব নাক ডাকা ক্ষতিকর নয়, তবে কখনও এটি স্লিপ অ্যাপনিয়ার লক্ষণ হতে পারে। স্লিপ অ্যাপনিয়ায় ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাস বন্ধ হয়ে আবার শুরু হয়। জোরে নাক ডাকার পাশাপাশি শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া, ঘুমের মধ্যে হাঁসফাঁস করা, বারবার জেগে ওঠা কিংবা সকালে মাথাব্যথার মতো লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ শুধু নাক ডাকার শব্দ কমানোর চেষ্টা করলেই সমস্যার সমাধান নাও হতে পারে। শ্বাসপ্রশ্বাসের কোনো অন্তর্নিহিত সমস্যা থাকলে সেটির চিকিৎসা প্রয়োজন।
নাক ডাকা কমানোর উপায় কী?
সাধারণ নাক ডাকার ক্ষেত্রে কিছু জীবনযাপনের পরিবর্তন উপকারী হতে পারে। ওজন বেশি থাকলে তা কমানো, ধূমপান বন্ধ করা এবং ঘুমানোর আগে অ্যালকোহল এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। চিৎ হয়ে শোয়ার পরিবর্তে কাত হয়ে ঘুমানোও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে নাক ডাকার প্রবণতা কমাতে পারে।
তবে নাক ডাকার পেছনে নাকের বাধা বা অ্যালার্জির মতো কারণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তার চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা শ্বাসনালি খোলা রাখতে মাউথগার্ড বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার জন্য সিপিএপি যন্ত্র ব্যবহারের পরামর্শ দিতে পারেন।
আর সঙ্গীর নাক ডাকার কারণে যদি আপনার নিজের ঘুম নিয়মিত নষ্ট হয়, তাহলে সমস্যাটিকে ছোট করে না দেখে দুজনেরই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। অনেক দম্পতি ‘অত্যন্ত দীর্ঘ সময়’ ধরে নাক ডাকার সমস্যা সহ্য করেন, যা তাদের সম্পর্ক ও সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলে। প্রয়োজনে সাময়িকভাবে ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার বা আলাদা ঘুমানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে দীর্ঘদিন সমস্যা চলতে থাকলে নাক ডাকার কারণ নির্ণয় করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: বিবিসি