দেশের অন্যতম বৃহৎ চালের মোকাম নওগাঁয় ধান ও চালের বাজারে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকায় এবং আমদানিকৃত চালের পর্যাপ্ত মজুত থাকায় বাজারে এই দরপতন ঘটেছে। এতে চালের দাম কমে সাধারণ ভোক্তারা স্বস্তি পেলেও ধানের বাজার পড়ে যাওয়ায় চরম হতাশা ও লোকসানে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
গত এক থেকে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের চালের দাম কেজিতে ১ থেকে ২ টাকা পর্যন্ত কমেছে। একই সঙ্গে গত বছরের তুলনায় কমেছে বিভিন্ন জাতের ধানের দামও। বর্ষালী ইরি বা আউশ ধানের দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি মণে ৫০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, মোকামে চালের পাইকারি বেচাকেনা কমে গেছে। এ কারণে কারখানার গুদামেও চালের মজুত জমে গেছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, নওগাঁর মোকামে স্থানীয়ভাবে চালের চাহিদা কমে যাওয়ায় ঢাকা ও চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের কাছে তাঁরা ‘পুশিং সেল’ করছেন। অর্থাৎ, চাহিদার তুলনায় বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ক্রেতার কাছে চাল বিক্রির জন্য চাপ দিচ্ছেন। ১ থেকে ২ টাকা লোকসান দিয়ে তাঁরা বাইরের ব্যবসায়ীদের কাছে চাল বিক্রি করছেন।
জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত চাল আমদানির কারণে দেশে বর্তমানে পর্যাপ্ত পরিমাণে চাল মজুত রয়েছে। এ কারণে মোকামে চালের চাহিদা কমে গেছে। গত তিন-চার বছরের তুলনায় এ সময়ে ধান-চালের দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। চালের চাহিদা না থাকায় মিলাররা ধান কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। এ কারণে বাজারে আউশ ধানের দাম ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
তিনি বলেন, কৃষকেরা যাতে ধানের ন্যায্য মূল্য পান, সেজন্য সরকারের আউশ মৌসুমেও চাল বা ধান কেনা উচিত। সরকারের সঠিক উদ্যোগই পারে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের বাঁচাতে। যেমনিভাবে সুগন্ধি চাল রপ্তানিতে ৫০ শতাংশ কোটা কমানোর আদেশের পর সুগন্ধি চালের দাম কেজিতে ৩০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত কমেছে।
স্থানীয় ধান-চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে নওগাঁর বাজারে আউশ ধান (পারিজা ও ব্রি ধান-৪৮) প্রতি মণ ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে এই ধান ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। গত বছর একই সময়ে এই ধানের দাম ছিল ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০ টাকা।
গত ইরি-বোরো মৌসুমে উৎপাদিত কাটারি ধান বর্তমানে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। গত বছর এ সময়ে দাম ছিল ১ হাজার ৮০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকা। আর জিরা ধানের দাম এখন ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা মণ। গত বছর এই সময়ে দাম ছিল ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় আউশ, কাটারি ও জিরা—তিন ধরনের ধানের দামই উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশেষ করে জিরা ধানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৪০০ টাকা পর্যন্ত দাম কমেছে।
ধানের পাশাপাশি চালের দামও কমেছে। বর্তমানে নওগাঁর মোকামে জিরা চাল প্রতি কেজি ৫৬ থেকে ৬১ টাকা এবং কাটারি চাল ৭৩ থেকে ৭৪ টাকা দরে পাইকারি বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে এসব চালের দাম কেজিতে প্রায় ২ টাকা কমেছে। আর এক মাসের ব্যবধানে দাম কমেছে ৩ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত। মোটা চাল হিসেবে পরিচিত স্বর্ণা চাল বর্তমানে ৪২ থেকে ৪৪ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে এই চাল ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।
এদিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চালের মান ও নিরাপত্তা নিয়েও মিলারদের সতর্ক করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলার চালকল মালিকদের নিয়ে অনুষ্ঠিত সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. ফরহাদ খোন্দকার ছাড়াও খাদ্য ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম মিলারদের সতর্ক করে বলেন, অভিযোগ আছে, চালে কৃত্রিমভাবে সুগন্ধি মেশানো হয়। কোনোভাবেই এ ধরনের প্রতারণা করা যাবে না। একই সঙ্গে চাল সাদা করার জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক ‘হাইড্রোজ’ ব্যবহার না করার জন্যও তিনি নির্দেশ দেন। এছাড়া কৃষকেরা যাতে ধানের ন্যায্য মূল্য পান, সেজন্য মিলারদের ধান কিনতে উদ্বুদ্ধ করা হয়।
প্রয়োজনে আউশ ধানের মতো যেসব ধানের চাহিদা নেই, সেসব ধান থেকে বেসরকারিভাবে বায়োফুয়েল উৎপাদনের কারখানা স্থাপনে মিলারদের সরকারের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা ফরহাদ খোন্দকার বলেন, বর্তমানে দেশে চালের মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে। ফলে আগামী তিন মাসে চালের দাম বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। বাজারে পর্যাপ্ত মজুত থাকায় সরবরাহ নিয়ে কোনো সংকটও নেই। কোনো ব্যবসায়ী অবৈধভাবে মজুত গড়ে তুলে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে চালের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করলে অভিযান চালিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, চালের বাজার স্থিতিশীল থাকলেও ধানের কম দামে কৃষকেরা কীভাবে উৎপাদন খরচ তুলবেন, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। কৃষকেরা যাতে ধানের ন্যায্য দাম পান, সে জন্য আউশ মৌসুমে সরকারিভাবে চাল কেনার পাশাপাশি ধান থেকে বায়োফুয়েল উৎপাদনের উদ্যোগ নিতে ব্যবসায়ীদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকার সহায়তা করবে বলেও জানানো হয়েছে।
কেএইচ/আরএন