ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
দূষণ ও অবৈধ দখলদারদের তালিকা হাললাগাদ করা হচ্ছে
নদীদূষণ রোধে একগুচ্ছ পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে সরকার
✎ তরিকুল ইসলাম সুমন
⏲ প্রকাশিত: সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:৪৮ পিএম আপডেট: ১৪.০৯.২০২৬ ৫:৫৭ পিএম
সংগৃহীত ছবি
X
Advertisement

সংগৃহীত ছবি

ঢাকার চারপাশের নদী বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা এবং ধলেশ্বরী। রাজধানীর পানি নিষ্কাশন, নৌযোগাযোগ, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য এসব নদীর গুরুত্ব অনেক। কিন্তু শিল্পবর্জ্য, পয়োবর্জ্য, গৃহস্থালি আবর্জনা ও নদীতীরের অবৈধ স্থাপনায় নদীগুলো এখন বিপর্যস্ত। একারণে  নদী দূষণমুক্ত ও পানিপ্রবাহ বাড়াতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে সরকার। স্বল্প মেয়াদে নদীতে বর্জ্য ফেলার উৎসমুখ বন্ধ করা হবে। প্রথমেই তুরাগ, বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরীতে অভিযান চালনো হবে। পরের ধাপে বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীতে। আর এসব অভিযান হবে সমন্বিত। এর আওতায় দূষণকারী কারখানা, ডকইয়ার্ড, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার তালিকা হালনাগাদ করে সেগুলোয় নিয়মিত অভিযান চালানো হবে। দায়ী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে আইনানুগ ব্যবস্থা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে নৌ যান সুমারি শুরু হয়েছে যাতে করে এদর উপরে নজরদারি বৃদ্ধ করা য়ায়। নদীপথে নিয়মিত টহল দেওয়া হবে। এসব কাজ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে মনিটরিং করা হবে। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় সেল গঠন করা হয়েছে। এই সেলের সমন্বয় করবে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। এসব কাজের ইন এইড টু সিভিল পাওয়ারের আওতায় নৌবাহিনীকে মাঠে নামানো হবে। 

জানা যায়, ঢাকার চারপাশের নদী নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ পর্যন্ত কয়েক দফায় বৈঠক করেছেন। দিয়েছেন নানা নির্দেশনা। তিনি চারপাশের নদীর অবস্থা নিজ চোখে দেখতে যাওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন। এছাড়াও ঢাকার যানজট কমাতে ইনার সার্কুলার রিং রোডের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও সংস্থাগুলো কাজ শুরু করেছেন। ওইসব সরকারি সংস্থাও বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিচ্ছে। এছাড়া ঢাকার চারপাশের নদীর অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর কার্যক্রম পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তার ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবরা পরিদর্শন করেছেন।

জানতে চাইলে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত বলেন, নদীগুলোর দূষণ বন্ধ করতে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশনা দিয়েছেন। বুড়িগঙ্গা-তুরাগ থেকে কাজ শুরু হবে। পাশাপাশি ঢাকার চারপাশের নদীতে যাত্রীবাহী ও পর্যটকবাহী নৌযান চালানোর জন্য বলা হয়েছে। আমরা বেসরকারি নৌযান মালিকদের উৎসাহিত করছি। তারা রাজি না হলে আমরা সরকারি নৌযান দিয়ে যাত্রী পরিবহণ শুরু করব। তিনি বলেন, প্রতি ২০ মিনিট পর নিয়মিত ট্রিপ হলে যাত্রী আকর্ষণ তৈরি হবে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলোয় অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঢাকার চারপাশে বৃত্তাকার ১১০ কিলোমিটার নৌপথ রয়েছে। নদী রয়েছে পাঁচটি। এসব নদী গাজীপুর, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জকে যুক্ত করেছে। একটি নদীর দূষণ বা প্রবাহ সংকট দেখা দিলে তা অন্য নদীগুলোর পানি, নাব্য ও পরিবেশকে প্রভাবিত করে। এজন্য প্রথমে তুরাগ, বুড়িগঙ্গা ও পরে ধলেশ্বর নদীতে অভিযান চালানো হবে। তারা জানান, তুরাগ নদীতে তুলনামূলক কম দূষণ ও দখলদার রয়েছে। এ নদীতে অভিযান শুরু করলে এর প্রভাব অন্য এলাকাগুলোয়ও ছড়িয়ে পড়বে। এতে কাজ করা সহজ হবে বলে ওইসব বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। ইতোমধ্যে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। তাদেরও দূষণ বন্ধে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইটিপি বসানোসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএর তালিকা অনুযায়ী, সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে দূষণের সবচেয়ে বড় উৎস ঢাকা ওয়াসার ৬৬টি বর্জ্য উৎসমুখ বা আউটলেট রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৩৭টি, ঢাকা দক্ষিণের ২১টি, ঢাকা উত্তরের ১৬টি ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের চারটি আউটলেট রয়েছে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালু নদীতে মোট ৬৩১টি দূষণ উৎসমুখ চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে বুড়িগঙ্গায় ২৫৮টি, তুরাগে ২৬৯টি, বালু নদীতে ১০৪টি এই তিন নদীর সংখ্যাই ৬৩১। এর বাইরে টঙ্গী খালের আরও ৬২টি বর্জ্য প্রবাহের পয়েন্ট চিহ্নিত হয়েছে।

তবে ২০২৬ সালের পরিদর্শনে বিআইডব্লিউটিএ শুধু বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে নতুন আরো ৪৯ টি নমুন মুখ শনাক্ত করেছে। এ নিয়ে শুধু বুড়িগঙ্গাতেই মোট বর্জ নির্গমণ মুখ রয়েছে ৩০৭ টি।

সংস্থাটির পরিচালক (বন্দর ও পরিবহন) মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, এসব মুখ দিয়ে বর্জ্য যাতে সরাসরি নদীতে না পড়ে, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নদীতীরের অবৈধ স্থাপনা, ডকইয়ার্ড ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মালিকদের নোটিশও দেওয়া হয়েছে। নদীতে বর্জ্য ও আবর্জনা না ফেলতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

নৌ পরিবহল মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়,  প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বৃত্তাকার নৌপথে যাত্রী ও পর্যটক পরিবহণে নৌযান নামানো হবে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ করপোরেশনকে ছয় মাসের মধ্যে ১০-১২ জন পরিবহণ করতে এমন ছোট আকারের ১২টি নৌযান বানানোর জন্য বলা হয়েছে। ওইসব নৌযান গাবতলী থেকে সদরঘাট হয়ে পোস্তগোলা পর্যন্ত প্রতি ২০-৩০ মিনিট পরপর ছেড়ে যাবে। 

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার চারপাশের নদ-নদীর দখল-দূষণ রোধ করে নদীর স্বাভাবিক নাব্য রক্ষা ও দখল হয়ে যাওয়া নদ-নদী পুনরুদ্ধার করতে কেন্দ্রীয় সেল গঠন করেছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ সেলের সদস্য রয়েছেন ৩৭ জন। কেন্দ্রীয় এ সেলের আহ্বায়ক হিসেবে থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব। এ সেলের অধীনে থাকবে তিনটি সাব-কমিটি।  ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু, ধলেশ্বরীসহ খাল, নালার দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও নদ-নদী পুনরুদ্ধারে এ সেল কাজ করবে। কেন্দ্রীয় এ সেলের উপদেষ্টা করা হয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের। এ সেলের সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকবে নৌবাহিনী।

৩৭ সদস্যের এ সেলের সদস্য করা হয়েছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগের সচিব, নৌবাহিনীর প্রতিনিধি (রিয়ার এডমিরাল পদমর্যাদার কর্মকর্তা), পুলিশের মহাপরিদর্শক, কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, রাজউক চেয়ারম্যান, বিআইডব্লিউটিএ এর চেয়ারম্যান, ঢাকার বিভাগী কমিশনার, নৌপুলিশের এআইজি, ঢাকা ওয়াসার এমডি, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ এবং গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী কর্মকর্তা, অ্যাটর্নি জেনারেলের প্রতিনিধি, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের জেলা প্রশাসক, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, ট্যানারি মালিক সমিতি ও ডক ইয়ার্ড এসোসিয়েশনের সভাপতি, এনজিও (পরিবেশ অধিদপ্তর মনোনীত), দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য অপসারণ, নদ-নদীর নাব্যতা অপসারণ, নদ-নদী পুনরুদ্ধার ও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিতে তিনটি সাব কমিটি গঠন করে তাদের কাজ পরিধি ঠিক করে দেওয়া হয়েছে।

সাব-কমিটি ১ শিল্পবর্জ্যসহ সব বর্জ্যের উৎসমুখ নিয়ন্ত্রণ, সাব-কমিটি ২ খাল ও ড্রেনের বর্জ্য অপসারণ, নদী পুনরুদ্ধার ও পানির প্রবাহ সচল রাখা এবং সাব-কমিটি ৩ নদীর তলদেশে জমে থাকা স্থায়ী বর্জ্য অপসারণসহ দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণের কাজ করবে। প্রতি মাসে কেন্দ্রীয় সেল তাদের কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করবে। বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারপাশের নদীগুলোতে দূষণ নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত চলমান প্রকল্পগুলোর পর্যালোচনা ও সমন্বয় করবে কেন্দ্রীয় সেল।

জানাগেছে, ঢাকার নদীগুলোতে প্রতিদিন পতিত হওয়া তরল বর্জ্যের প্রায় ৬০-৬১ শতাংশ আসে বিভিন্ন শিল্প-কারখানা থেকে এবং বাকি ৩৯-৪০শতাংশ আসে গৃহস্থালী ও অন্যান্য উৎসমুখ থেকে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন পরিবেশ সমীক্ষা অনুযায়ী, বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চলের প্রায় ৭,০০০ এরও বেশি শিল্প-কারখানা থেকে প্রতিদিন প্রায় ২৪০ কোটি লিটার (২.৪ বিলিয়ন লিটার) অপরিশোধিত বিষাক্ত রাসায়নিক ও তরল বর্জ্য চারপাশের জলাশয় ও নদীগুলোতে ফেলা হচ্ছে। অপরদিকে গৃহস্থালী বর্জ্য ও পয়োবর্জ্য দৈনিক প্রায় কোটি লিটারের বেশি অপরিশোধিত ময়লা পানি সরাসরি নদীগুলোতে যায়। ঢাকার মাত্র ২শতাংশ এলাকা প্রোপার সুয়্যারেজ (পয়ঃনিষ্কাশন) নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছে, যার ফলে বাকি ৯৮শতাংশ গৃহস্থালী পয়োবর্জ্যই সরাসরি বা ড্রেনের মাধ্যমে নদীতে চলে যায়।

টিএস

Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝
Advertisement