ছিনতাইকারীদের হাতে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। একই সময়ে ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নামও আসছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার বনানীতে ডাকাতির প্রস্তুতির অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। তাঁদের মধ্যে র্যাবের একজন সদস্য ছিলেন। তাঁদের কাছ থেকে বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন, ওয়াকিটকি ও বাংলাদেশ পুলিশের মনোগ্রামযুক্ত হাতকড়া উদ্ধার করা হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ১৩৪টি মামলা হয়েছে। জুন পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭২টিতে এবং গ্রেপ্তার করা হয় ৪০২ জনকে। ২০২৫ সালে পুরো বছরে ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছিল ৫৩১টি, গ্রেপ্তার হয়েছিল ১ হাজার ৪৩৫ জন। তবে মামলার সংখ্যা কম-বেশি হওয়া দিয়ে পুরো পরিস্থিতি বোঝা যাচ্ছে না। কারণ পুলিশ বলছে, রাজধানীতে এখনো ১ হাজার ৩৮৭ জন সক্রিয় ছিনতাইকারী তালিকাভুক্ত রয়েছে এবং তাঁদের প্রায় ৮০ শতাংশের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।
ছিনতাইয়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা নিয়েও পুলিশের তালিকা রয়েছে। রাজধানীতে ৩০০টির বেশি জায়গাকে ছিনতাইয়ের স্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক স্থানকে বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় রাতের পাশাপাশি ভোরেও এসব ঘটনা ঘটছে। দূরপাল্লার বাস থেকে নামা যাত্রী, একা চলা পথচারী এবং টাকা বহনকারী ব্যক্তিদের টার্গেট করার ঘটনাও সামনে এসেছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা ছিনতাইয়ের ধরনও বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ৯ আগস্ট উত্তরা এলাকায় একটি পেট্রল পাম্পের টাকা ব্যাংকে নেওয়ার সময় তিনটি মোটরসাইকেলে আসা একদল ব্যক্তি গাড়ি আটকে ১ কোটি ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকা নিয়ে যায়। তারা ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে আক্রমণ করে। এমন ঘটনায় বোঝা যায়, এখন অনেক ক্ষেত্রে সুযোগ পেলেই ছিনতাই নয়; আগে থেকে লক্ষ্য নির্ধারণ করেও অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।
অপরাধ দমনে পুলিশের অভিযানও চলছে। চলতি বছরের ১ মে থেকে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে ১০ জুন পর্যন্ত সারা দেশে ১৮ হাজার ৩২৮ জনকে গ্রেপ্তার করার কথা জানিয়েছিল পুলিশ সদর দপ্তর। তাঁদের মধ্যে ২ হাজার ২১১ জন ছিনতাইকারী ও ডাকাত এবং ৩৩১ জন অবৈধ অস্ত্রধারী ছিলেন।
তারপরও একই ধরনের ঘটনা থামছে না। এর অন্যতম কারণ হিসেবে পুলিশের তালিকায় থাকা পুনরাবৃত্ত অপরাধীদের বিষয়টি সামনে আসছে। একাধিক মামলার আসামিদের একটি বড় অংশ আবারও একই অপরাধে যুক্ত হচ্ছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, কেউ গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়ানোর ঘটনাও রয়েছে।
অপরাধের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততার ঘটনাগুলোও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। শুধু সেপ্টেম্বরের বনানীর ঘটনায় নয়, এর আগে সোনা ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের একাধিক ঘটনায় সাবেক বা কর্মরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নাম এসেছে। এতে অপরাধীরা অস্ত্র, পরিচয়, যোগাযোগব্যবস্থা বা প্রশিক্ষণের সুবিধা পাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে।
অর্থনৈতিক চাপও পুরো পরিস্থিতির বাইরে নয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বাংলাদেশে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে। একই সংস্থার হিসাবে, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে কর্মক্ষম বয়সে প্রবেশ করা প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণের বিপরীতে নতুন কাজ তৈরি হয়েছিল ৮৭ লাখ। অর্থাৎ শ্রমবাজারে প্রবেশ করা বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি।
তবে শুধু বেকারত্ব বা দারিদ্র্য দিয়ে ছিনতাইয়ের বিস্তার ব্যাখ্যা করা যায় না। ছিনতাইকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। অর্থাৎ এটি এখন শুধু বিচ্ছিন্নভাবে ঘটে যাওয়া অপরাধ নয়; কিছু এলাকায় অপরাধী চক্র, পুনরাবৃত্ত অপরাধ এবং অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারের সঙ্গে এর যোগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় লুট হওয়া বিপুলসংখ্যক অস্ত্রের একটি অংশ এখনো উদ্ধার না হওয়ার তথ্যও সামনে এসেছে। সব অবৈধ অস্ত্র ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে, এমন প্রমাণ নেই। তবে অপরাধীদের হাতে অস্ত্রের সহজলভ্যতা থাকলে সাধারণ ছিনতাইও দ্রুত প্রাণঘাতী ঘটনায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
সব মিলিয়ে রাজধানীর ছিনতাই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু অপরাধীর সংখ্যা নয়। একদিকে সক্রিয় অপরাধীদের বড় তালিকা, অন্যদিকে একাধিক মামলার পরও একই অপরাধে ফিরে আসা, নির্দিষ্ট হটস্পটে বারবার ঘটনা এবং কিছু ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততা—সব মিলিয়ে আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এখন শুধু অভিযান চালিয়ে কয়েক শ ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়। একই ব্যক্তির বারবার অপরাধে ফেরার কারণ, অপরাধী চক্রের অর্থ ও অস্ত্রের উৎস এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তর থেকে অপরাধে সহযোগিতার সুযোগ—এসব বন্ধ করতে না পারলে ছিনতাইয়ের ভয় কমবে না। ঢাকার রাস্তায় মানুষের নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে অপরাধী গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অপরাধের পুরো ব্যবস্থাটিকে ভাঙাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।