আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনে বছরে জাহাজ ভাড়া বাবদ খরচ হচ্ছে ১৪ থেকে ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে দেশীয় মালিকানাধীন জাহাজগুলোর হিস্যা মাত্র ১ থেকে দেড় বিলিয়ন ডলার। ফলে বাকি অর্থ চলে যাচ্ছে বিদেশি জাহাজ মালিকদের কাছে। অথচ ফ্ল্যাগ ভেসেল অ্যাক্ট অনুযায়ী, দেশীয় মালিকানাধীন জাহাজের মাধ্যমে ৫০ শতাংশ পণ্য পরিবহনের আইনগত অধিকার রয়েছে বাংলাদেশের। যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৭ থেকে ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে মাদার ভেসেলের সংকটে সেই হিস্যা ঘরে তোলা সম্ভব হচ্ছে না।
আমদানি-নির্ভর বাংলাদেশে প্রতি বছর পণ্য আনা-নেওয়ার কাজে বিপুলসংখ্যক জাহাজ ব্যবহার হয়। এসব জাহাজের ভাড়া বাবদ ব্যয় হওয়া ১৪ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে দেশীয় জাহাজ মালিকরা পাচ্ছেন মাত্র ১ থেকে দেড় বিলিয়ন ডলার। বাকি অর্থ ডলার আকারে চলে যাচ্ছে বিদেশি জাহাজ মালিকদের কাছে।
মার্চেন্ট মেরিন অফিসার অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, ‘৪০ শতাংশ পণ্য দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজে পরিবহন হবে, ২০ শতাংশ থাকবে বাফার জোনে এবং বাকি ৪০ শতাংশ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার আওতায় থাকবে। কারণ, গ্লোবাল ওপেন ট্রেডের এই ব্যবস্থায় কোনো দেশই তার পুরো বাণিজ্য নিজেদের জাহাজের মাধ্যমে পরিবহন করতে পারে না; বিদেশি জাহাজকেও সেই সুযোগ দিতে হয়।’
নৌবাণিজ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশি মালিকানাধীন ১০৮টি জাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে ৮৭টি বাল্ক কার্গো পণ্যবাহী, ৫টি ট্যাংকার, ৫টি অয়েল ট্যাংকার, ২টি গ্যাস ক্যারিয়ার এবং ৮টি কনটেইনারবাহী জাহাজ। জাহাজ মালিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২৮টি জাহাজ রয়েছে মেঘনা গ্রুপের, ২৭টি কেএসআরএমের, ১১টি আকিজ গ্রুপের, ৮টি এইচ আর লাইন্সের এবং ৭টি করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন ও ভ্যানগার্ড গ্রুপের।
চট্টগ্রাম নৌবাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন শেখ জালাল উদ্দিন গাজী বলেন, ‘৫০ শতাংশ কার্গো পরিবহনের একটি বিধান রয়েছে। এটা আমাদের অধিকার। জাহাজ শিল্প একটি বড় শিল্প। এর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যবসা থেকেও আমরা উপকৃত হব। যেমন শিপ ম্যানেজমেন্ট, শিপ সাপ্লাইস এবং অন্যান্য শিপ-সম্পর্কিত কারিগরি সহায়তার সুযোগ তৈরি হবে।’
সবশেষ চলতি বছর বাংলাদেশি মালিকানাধীন জাহাজের বহরে ৩টি জাহাজ যুক্ত হয়েছে। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে যুক্ত হয়েছিল ৮টি জাহাজ। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আরও ৪টি জাহাজ কেনার প্রক্রিয়া চলছে বলে নিশ্চিত করেছে নৌবাণিজ্য অধিদপ্তর। প্রতি বছর চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি-রপ্তানি পণ্য বহনকারী ৪ হাজার ২০০ থেকে ৪ হাজার ৩০০ জাহাজ আসা-যাওয়া করে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন মো. সালাহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘গত তিন বছরের মধ্যে আমাদের ১০৮টি জাহাজ হয়েছে। এর ফলে দেশের টাকা দেশেই থাকবে এবং আমরা ডলার আয় করতে পারব। আমরা জাহাজ চার্টার দিতে পারছি। আমাদের মেরিন একাডেমিগুলোও রয়েছে। ফলে আমাদের লোকজনের চাকরির অভাব হবে না।’
আঙ্কটার্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী, মোট সমুদ্র বাণিজ্যে ৪০ শতাংশ দেশীয় ভেসেল, ৪০ শতাংশ বিদেশি ভেসেল এবং বাকি ২০ শতাংশ যৌথ মালিকানাধীন ভেসেল পরিবহন করতে পারবে।
বিশ্ব সমুদ্র বাণিজ্যে সক্ষমতা অর্জনে বাংলাদেশের এই মুহূর্তে প্রয়োজন জ্বালানি তেলবাহী অয়েল ট্যাংকার এবং কনটেইনারবাহী মাদার ভেসেল। কিন্তু বাংলাদেশি মালিকানাধীন ১০৮টি জাহাজের মধ্যে অয়েল ট্যাংকার ও কনটেইনার ভেসেলের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য।