একটি শিশুর মৃত্যু কখনোই শুধু একটি সংখ্যা নয়।
একটি শিশুর মৃত্যু মানে একটি মায়ের বুক খালি হয়ে যাওয়া। একটি বাবার সমস্ত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এক মুহূর্তে অর্থহীন হয়ে যাওয়া। একটি পরিবারের ঘরে নেমে আসা এমন এক নীরবতা, যার কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই।
কিন্তু রাষ্ট্র যখন সংকটের হিসাব করে, তখন মৃত্যু শেষ পর্যন্ত একটি সংখ্যায় পরিণত হয়।
বাংলাদেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা এখন প্রায় এক হাজার। ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে ১,০০৯ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো। একই সময়ে ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে।
এই সংখ্যা শুধু ভয়াবহ নয়। এটি অস্বস্তিকরও।
কারণ হাম এমন কোনো অজানা বা অপ্রতিরোধ্য রোগ নয়, যার বিরুদ্ধে মানুষের হাতে কোনো অস্ত্র নেই। এর বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা রয়েছে। দশকের পর দশক ধরে বিশ্বের বহু দেশ টিকাদানের মাধ্যমে হাম নিয়ন্ত্রণ করেছে।
তাহলে বাংলাদেশে এত মৃত্যু হলো কীভাবে?যে রোগকে ঠেকানো সম্ভব, সেখানে মৃত্যু কেন?বাংলাদেশ একসময় হাম নির্মূলের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব সেই অর্জনকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
মার্চে শুরু হওয়া সংক্রমণ এখন দেশের প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে অসুস্থ শিশুর চাপ। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর বাড়ছে কাজের বোঝা। আর সন্তানকে বাঁচাতে অসহায় বাবা-মায়েরা ছুটছেন এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে।
এটি তাই কেবল একটি সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব নয়।
এটি বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রস্তুতি, টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা, সরবরাহব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতারও পরীক্ষা।
আর সেই পরীক্ষায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো-
আমরা কি সময়মতো প্রস্তুত ছিলাম?
‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হলো কীভাবে?বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বর্তমান প্রাদুর্ভাবের অন্যতম বড় কারণ শিশুদের মধ্যে তৈরি হওয়া ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’- অর্থাৎ পর্যাপ্ত সংখ্যক শিশুর শরীরে হাম প্রতিরোধী সুরক্ষা তৈরি না হওয়া।
২০২৪-২৫ সালে হাম-রুবেলা টিকার সরবরাহে ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন এবং জাতীয় পর্যায়ে নিয়মিত সম্পূরক টিকাদান কার্যক্রমের অনুপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করেছে।
প্রাদুর্ভাবের শুরুতে আক্রান্তদের বড় একটি অংশ ছিল টিকা না পাওয়া অথবা অসম্পূর্ণ টিকা পাওয়া শিশু। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা ছিল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি।
টিকা থেকে কোনো শিশু বাদ পড়া সবসময় পরিবারের অবহেলার ফল নয়। কোথাও টিকার তথ্য পৌঁছায় না। কোথাও স্বাস্থ্যকেন্দ্র দূরে। কোথাও সরবরাহ থাকে না। কোথাও কর্মসূচি নিয়মিত হয় না।
অর্থাৎ একটি শিশুর টিকা না পাওয়ার পেছনে শুধু পরিবারের সিদ্ধান্ত নয়, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
সেখানেই শুরু হয় জবাবদিহির প্রশ্ন।
টিকা সংগ্রহ ও কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন কেন?স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টিকা সংগ্রহের নীতিতে পরিবর্তনের কারণে সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। একই সঙ্গে ২০২৪ সালে একটি টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে দেওয়া এবং পরের বছর জাতীয় হাম-রুবেলা কর্মসূচি বাতিল হওয়ার বিষয়ও সামনে এসেছে।
যদি এসব তথ্য সঠিক হয়, তাহলে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
টিকার ঘাটতি সম্পর্কে যদি জানা থাকে, তাহলে আগেই ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন?শিশুদের টিকাদানে ঘাটতি সম্পর্কে যদি জানা থাকে, তাহলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হলো না কেন?আর ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকলে, সেই ব্যবস্থা কেন এতগুলো মৃত্যু ঠেকাতে পারল না?এগুলো রাজনৈতিক স্লোগান নয়।
এগুলো জনস্বাস্থ্যের মৌলিক প্রশ্ন।
একটি সরকারের কাছে জনগণ শুধু চিকিৎসা চায় না; তারা চায় বিপদ আসার আগেই রাষ্ট্র যেন বিপদ চিনতে পারে।
১,০০৯ সংখ্যাটির পেছনে যে পরিবারগুলো আছে
ঢাকার কোনো শিশু হাসপাতালে অসুস্থ সন্তানকে কোলে নিয়ে বসে থাকা মা ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বোঝেন না।
⚫তিনি জানেন- তার সন্তান জ্বরে পুড়ছে।
⚫তিনি জানেন-শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
⚫তিনি জানেন- শরীরে র্যাশ উঠেছে।
⚫তিনি শুধু চান, তার সন্তান বেঁচে থাকুক।
জেলা শহরের কোনো হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা বাবা জানেন না টিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়া কোথায় আটকে ছিল। তিনি জানেন না কোন দপ্তর কখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি শুধু জানেন, সন্তানকে নিয়ে তাকে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে হয়েছে।
এপি-এর প্রতিবেদনে ঢাকার একটি শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আট মাস বয়সী একটি শিশুর করুণ পরিস্থিতির কথা উঠে এসেছে। দূরবর্তী এলাকা থেকে সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় ছুটে আসা সেই মায়ের গল্প আসলে একা কোনো মায়ের গল্প নয়।
এটি এখন বাংলাদেশের বহু পরিবারের গল্প।
একটি জাতীয় স্বাস্থ্য সংকটের প্রকৃত চেহারা পরিসংখ্যানের টেবিলে নয়- দেখা যায় হাসপাতালের ভিড়ে, মায়ের চোখে এবং সন্তানের শ্বাসকষ্টে।
হাম একা আসে নাহামের বিপদ শুধু জ্বর বা শরীরে র্যাশ ওঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
গুরুতর আক্রান্ত শিশুদের নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি কিংবা এনসেফালাইটিসের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। WHO-এর মতে, হাম নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহ, অন্ধত্ব এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
তাই হাম মোকাবিলার অর্থ শুধু টিকা দেওয়া নয়।
প্রয়োজন-
⚫দ্রুত রোগ শনাক্ত করা;
⚫পর্যাপ্ত শিশু চিকিৎসা নিশ্চিত করা;
⚫অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রস্তুত রাখা;
⚫অপুষ্ট শিশুদের বিশেষ সহায়তা দেওয়া;
⚫হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা;
⚫এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনা।
এর সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে ডেঙ্গু।
একদিকে হাম, অন্যদিকে ডেঙ্গু- দুই দিকের চাপ একই স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর পড়লে দুর্বলতাগুলো আর লুকিয়ে রাখা যায় না।
হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ, অক্সিজেন- সবকিছুর সীমাবদ্ধতা তখন সরাসরি মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
‘ব্যর্থতা’ শব্দটি কি খুব কঠিন?সরকার ব্যর্থ কি না- রাজনৈতিকভাবে এই প্রশ্ন নিয়ে বিতর্ক হতে পারে।
কিন্তু জনস্বাস্থ্যের বিচারে প্রশ্নটি আরও সরল।
প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে এত মৃত্যু কেন হলো?কোনো সরকারই সব রোগের সংক্রমণ শূন্যে নামিয়ে আনতে পারে না। কিন্তু হাম এমন একটি রোগ, যার বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা রয়েছে এবং উচ্চ টিকাদান কভারেজের মাধ্যমে যার বিস্তার ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তাই প্রশ্নটি শুধু-
কতজন মারা গেলেন?প্রশ্নটি বরং-
কতজনকে আগে থেকেই রক্ষা করা যেত?একটি শিশু যদি সময়মতো দুই ডোজ টিকা পেত, তাহলে হয়তো তাকে আজ হাসপাতালের শয্যায় থাকতে হতো না।
একজন মা হয়তো আজ সন্তানের মৃত্যুসনদ হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরতেন না।
একটি পরিবার হয়তো আজ শোকের মধ্যে ডুবে থাকত না।
এই সম্ভাব্য প্রতিটি জীবনই একটি জবাবদিহির প্রশ্ন।
এখন দায় চাপানোর চেয়ে জরুরি কী?এই মুহূর্তে রাজনৈতিক দোষারোপের চেয়েও জরুরি কাজ হলো সংক্রমণ থামানো।
আর একটি শিশুও যেন প্রতিরোধযোগ্য এই রোগে প্রাণ না হারায়- এটাই এখন অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
ইউনিসেফ-এর মতে, হাম নিয়ন্ত্রণে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুর দুই ডোজ টিকা পাওয়া প্রয়োজন। সরকার ইতোমধ্যে ডব্লিউএইচও, ইউনিসেফ, গ্যাভি-এর সহায়তায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি নিয়েছে এবং প্রায় দুই কোটি শিশুকে এর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
কিন্তু যথেষ্ট নয়।
কারণ জরুরি টিকাদান কর্মসূচি আগের ঘাটতি পূরণ করতে পারে; কিন্তু একটি দুর্বল নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থা থেকে ভবিষ্যতের সংকটকে স্থায়ীভাবে দূরে রাখতে পারে না।
প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা-
⚫যেখানে কোনো শিশু টিকা থেকে বাদ পড়লে তার তথ্য পাওয়া যাবে।
⚫যেখানে টিকার সরবরাহ বন্ধ হওয়ার আগেই সতর্ক সংকেত পাওয়া যাবে।
⚫যেখানে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুরাও শহরের শিশুর মতোই টিকা পাওয়ার সুযোগ পাবে।
⚫এবং যেখানে কোনো মহামারি শুরু হওয়ার পর নয়, তার আগেই রাষ্ট্র প্রস্তুত থাকবে।
⚫মায়েদের প্রশ্নের উত্তর কে দেবে?
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা একসময় হাম নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে।
সেই অর্জন হারিয়ে ফেলার অর্থ শুধু একটি স্বাস্থ্যসূচকের অবনতি নয়।
এর অর্থ- পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি।
আজ যে মায়ের সন্তান নেই, তাকে কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে সান্ত্বনা দেওয়া যাবে না।
যে বাবা সন্তানের চিকিৎসার জন্য শেষ সম্বলটুকু ব্যয় করেছেন, তাকে কোনো সরকারি বিবৃতি দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না।
আর যে শিশুটি সময়মতো একটি টিকা পেলে হয়তো বেঁচে যেত, তার মৃত্যুকে কেবল ‘প্রাদুর্ভাবের পরিসংখ্যান’ বানিয়ে ফেলা যাবে না।
তাই প্রশ্নটি থেকেই যায়-
প্রায় এক হাজার মৃত্যু কি কেবল একটি ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের দুর্ভাগ্য, নাকি এর মধ্যে প্রশাসনিক ব্যর্থতারও কোনো অংশ রয়েছে?⚫এই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, খুঁজতে হবে নিরপেক্ষ তদন্তে।
⚫খুঁজতে হবে টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে।
⚫খুঁজতে হবে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির কোথায় কোথায় ভাঙন তৈরি হয়েছিল, তা শনাক্ত করে।
⚫খুঁজতে হবে কেন ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের সময়মতো সুরক্ষার আওতায় আনা যায়নি।
⚫এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- কোথায় ভুল হয়েছিল, তা স্বীকার করার মতো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সাহস থাকতে হবে।
⚫কারণ একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সাফল্য শুধু কতজনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে না।
⚫সাফল্যের আসল পরীক্ষা হলো- কতজনকে অসুস্থ হওয়ার আগেই বাঁচানো গেছে।
⚫আজ যে মায়ের বুক খালি হয়েছে, তার সন্তানকে ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা কোনো সরকারের নেই।
⚫কিন্তু আগামীতে মায়ের বুক যেন খালি না হয়- সেই দায়িত্ব রাষ্ট্রের আছে, সেই দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও নেই।
-টিএস