লক্ষ্মীপুরের রামগতির মেঘনা নদীর ইলিশের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট—এমন অভিযোগ স্থানীয় জেলে ও সংশ্লিষ্টদের। নদী থেকে জেলের জালে ইলিশ ধরা পড়ার পর আড়ত, পাইকার ও খুচরা বাজারের কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে মাছ পৌঁছায় ভোক্তার হাতে। এতে জেলেদের বিক্রি করা দামের তুলনায় খুচরা বাজারে ইলিশের দাম বেড়ে যাচ্ছে প্রায় তিন থেকে চার গুণ।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) এক সমীক্ষাতেও বিভিন্ন ধাপে ইলিশের দাম বাড়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে মূল্য বৃদ্ধির কারণে সাধারণ ক্রেতাদের বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে। অন্যদিকে উৎপাদনের মূল উৎস জেলেরা পাচ্ছেন না ইলিশের ন্যায্য দাম।
উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রামগতিতে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। মেঘনা নদীর তীরে রয়েছে অন্তত ১০টি মাছঘাট। সরেজমিনে আলেকজান্ডার ও বয়ারচর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে দেখা যায়, সেখানে ইলিশ সাধারণত ওজন করে নয়, বরং নিলামের মাধ্যমে হালি বা পিস হিসেবে বিক্রি করা হয়।
আড়তে জেলেরা এক কেজি ওজনের একটি ইলিশ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করছেন। অথচ একই ইলিশ কয়েক দফা হাতবদল হয়ে খুচরা বাজারে পৌঁছালে কেজিপ্রতি ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে জেলের কাছ থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর আগেই মাছটির দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে।
দাদনের ফাঁদে জেলেরা
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নদী ও সাগরে ট্রলার নিয়ে মাছ ধরতে যেতে জ্বালানি ও রসদ বাবদ জেলেদের ২ লাখ টাকার বেশি খরচ হয়। এ ব্যয় মেটাতে জেলেদের একটি বড় অংশ আড়তদার ও দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নেন।
ফলে মাছ ধরার পর দাদনদাতাদের নির্ধারণ করে দেওয়া দামেই ইলিশ বিক্রি করতে বাধ্য হন জেলেরা। নিজেদের মতো করে দরদাম করার সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই থাকে না। এতে ইলিশ বিক্রির লাভের বড় অংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে।
কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ
জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির রামগতি উপজেলা সভাপতি মীর হাছান মাহমুদ মামুন ও স্থানীয়রা বলেন, চাষের মাছের মতো ইলিশ উৎপাদনে পোনা, খাবার কিংবা পরিচর্যার খরচ নেই। ইলিশ ধরার ক্ষেত্রে জেলেদের শ্রম, নৌকা ও জালই মূল বিষয়। এরপরও ভোক্তা পর্যায়ে ইলিশের দাম অস্বাভাবিক বেশি হওয়া বাজারে কৃত্রিম সংকট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি সামনে আনে।
তাদের মতে, জেলেদের দাদননির্ভরতা কমাতে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ইলিশের বাজারে মৎস্য বিভাগের কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, জেলেদের জালে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ইলিশ না পড়া এবং পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে অতিরিক্ত দাম বাড়ানোর কারণে ইলিশের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মৎস্য বিভাগ মাঠপর্যায়ে কাজ করছে।
জেলেদের অভিযোগ, নদী থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত ইলিশের সরবরাহব্যবস্থায় একাধিক ধাপে মূল্য বাড়লেও সেই বাড়তি দামের সুফল জেলেরা পাচ্ছেন না। ফলে একদিকে ভোক্তাদের উচ্চমূল্যে ইলিশ কিনতে হচ্ছে, অন্যদিকে মাছের প্রকৃত উৎপাদক জেলেরা থেকে যাচ্ছেন ন্যায্য দামবঞ্চিত।
আরএম/আরএন