কোনো দেশ যখন একটি সামরিক জোটে যোগ দেয়, তখন সে শুধু একটি কাগজে স্বাক্ষর করে না—সে তার ভবিষ্যতের কিছু সিদ্ধান্তও অন্যের হাতে তুলে দেয়। আপাতভাবে ব্যাপারটি হয়তো বেশ সুন্দর দেখাতে পারে—বন্ধুত্ব, ভ্রাতৃত্ব, পারস্পরিক সহযোগিতা, যৌথ নিরাপত্তা। কিন্তু যত পরিণত বোধবুদ্ধি দিয়ে গভীরে যাওয়া যায়, ততই চমকে উঠতে হয়। বাংলাদেশকে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা’ চুক্তিতে যুক্ত করার আলোচনা তাই নিছক কূটনৈতিক সৌজন্যের বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব, অর্থনীতি এবং দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে জড়িত একটি গুরুতর প্রশ্ন। মুসলিম-অধ্যুষিত একটি দেশ হিসেবে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতার প্রস্তাব শুনতে আবেগময় ও আকর্ষণীয় মনে হতেই পারে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা আবেগ দিয়ে করা যায় না। রাষ্ট্রকে টিকে থাকতে হয় ভূগোল, অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা এবং স্বার্থের কঠিন হিসাবের ওপর।
মক্কা প্যাক্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে এর পারস্পরিক প্রতিরক্ষার (collective defence) অঙ্গীকার। চুক্তির কাঠামো ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর আদলে তৈরি; অর্থাৎ কোনো এক সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে অন্য সদস্যদের ওপরও হামলা হিসেবে বিবেচনা করার নীতি রয়েছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও এই ধারাকে ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর সঙ্গে কারিগরিভাবে অভিন্ন বলে বর্ণনা করেছেন। এখন প্রশ্নটি খুব সরল: পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধ হলে বাংলাদেশ কী করবে?
প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। পাকিস্তান আক্রান্ত হলে বাংলাদেশ কি পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করবে? ভারত যদি পাকিস্তানের ওপর হামলা করে, তবে সেই হামলাকে কি বাংলাদেশের ওপর হামলা হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে? বাংলাদেশ কি তখন বলবে, ‘আমরা যুদ্ধ চাই না, আমরা নিরপেক্ষ’? নাকি চুক্তির দায়বদ্ধতা দেখিয়ে সৈন্য পাঠাতে হবে? যদি এর উত্তর আগে থেকেই পরিষ্কার না থাকে, তবে বাংলাদেশের কোনো সামরিক জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি পরিচিত ভিত্তি—‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’। এই নীতিকে অনেকেই দুর্বলতার লক্ষণ মনে করেন। আসলে এটি দুর্বলতার নয়, বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রের স্বস্তি ও শান্তির সঙ্গে টিকে থাকার মোক্ষম নীতি। কারণ, আমাদের সামরিক শক্তিও এমন নয় যে আমরা একসঙ্গে একাধিক শক্তির সঙ্গে সংঘাতে গিয়ে দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারি। বাংলাদেশের শক্তি তার ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিতে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো, আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান। প্রায় তিন দিকে ভারত, একটু কোণার দিকে মিয়ানমার, আর দক্ষিণভাগে বঙ্গোপসাগর। কোনো সংঘাতের সময় ভারত ও মিয়ানমার যদি স্থল, আকাশ ও জলপথ বন্ধ করে দেয়, তাহলে দূরের কোনো মিত্র আমাদের জন্য কতটা বাস্তব সাহায্য নিয়ে আসতে পারবে? বিমানে অস্ত্র আসবে কোন আকাশপথ দিয়ে? জাহাজ আসবে কোন সমুদ্রপথে? যুদ্ধের সময় কাগজের বন্ধুত্ব দিয়ে তো রসদ আসে না।
বাংলাদেশের ইতিহাসেও এর নির্মম শিক্ষা আছে। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় বাংলাদেশ তখন পূর্ব পাকিস্তান। একই রাষ্ট্রের অংশ হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তান কার্যত অরক্ষিত ছিল। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলকে রক্ষার জন্য পাকিস্তান কী করেছিল—এই ইতিহাস আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। তখন আমরা পাকিস্তানের সঙ্গে এক দেশ ছিলাম; কোনো সামরিক জোটের বাইরের দেশ ছিলাম না। তবু বিপদের সময়ে পূর্ব পাকিস্তান ছিল মূলত একা।
আজ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ। সেই স্বাধীনতার জন্য ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছেন, দুই লাখের বেশি নারী সম্ভ্রম হারিয়েছেন পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও দোসরদের হাতে। পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য হতে পারে, কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকতে পারে—কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে পাশ কাটিয়ে পাকিস্তানের হয়ে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়া কি আত্মঘাতী নয়? এমন পরিস্থিতি তৈরি করাই বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী।
তাহলে মক্কা প্যাক্টে আমাদের প্রয়োজনটা কোথায়?
বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এই মুহূর্তে কোনো প্রত্যক্ষ সামরিক হুমকি নেই। সৌদি আরবের নিরাপত্তা-উদ্বেগ এক ধরনের, পাকিস্তানের আরেক ধরনের, তুরস্কের আরেক ধরনের। ইরান-সৌদি দ্বন্দ্ব, ভারত-পাকিস্তান বিরোধ, ইসরায়েলকে ঘিরে তুরস্কের নিরাপত্তা-রাজনীতি—এসব তাদের বাস্তবতা। বাংলাদেশের বাস্তবতা আলাদা। অন্যের নিরাপত্তা-সমীকরণকে নিজের নিরাপত্তা-সমীকরণ বানিয়ে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
ধরা যাক, কাল মিয়ানমার বাংলাদেশে হামলা করল। তখন কি পাকিস্তান মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে? সৌদি আরব কি বাংলাদেশকে রক্ষার জন্য সেনা পাঠাবে? তুরস্ক কি বঙ্গোপসাগরের পথে সামরিক সহায়তা নিয়ে হাজির হবে? বাস্তবতার প্রশ্নগুলো কাগজের চুক্তির চেয়ে অনেক বেশি নির্মম।
সামরিক জোটের ইতিহাসও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। CENTO, SEATO, NATO—প্রতিটি জোটের নিজস্ব ইতিহাস আছে, নিজস্ব স্বার্থ আছে। শক্তিশালী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং দুর্বল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এক জিনিস নয়। কাগজে সবাই সমান, কিন্তু বাস্তবে সামরিক শক্তি, অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের ওজন সমান নয়।
সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির কথাও বিবেচনায় রাখা দরকার। তৃতীয় পক্ষের আক্রমণের ক্ষেত্রে একে অন্যকে সহায়তার অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু সৌদি আরব ইরানি হামলার মুখে পাকিস্তানের সাহায্য চাওয়ার পরও পাকিস্তান সরাসরি সৌদির হয়ে যুদ্ধে নামেনি—এমন প্রতিবেদন সামনে এসেছে। কারণটি সহজ: রাষ্ট্র বন্ধুত্বের জন্য নিজের অস্তিত্বের ঝুঁকি নেয় না। পাকিস্তানও নেয়নি। তাহলে বাংলাদেশ কেন নেবে?
রাষ্ট্রের বন্ধুত্ব থাকতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের আত্মহত্যার অধিকার নেই।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত, পানি, প্রত্যর্পণ, বাণিজ্য—বহু বিষয়ে মতবিরোধ থাকতে পারে। কিন্তু কথায় কথায় ভারতবিরোধিতা বাংলাদেশের জন্য কোনো কৌশল নয়। সামরিক যুদ্ধের চেয়ে অর্থনৈতিক যুদ্ধ অনেক সময় বেশি ভয়ংকর। বাংলাদেশের জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, সার, পানি, বাণিজ্যপথ—সবকিছুর সঙ্গে প্রতিবেশী ভূগোলের সম্পর্ক আছে। ভারত আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী; তাকে শত্রু বানিয়ে কোনো দূরদেশের নিরাপত্তা-ছাতার নিচে দাঁড়ানো মানে নিরাপদ হয়ে যাওয়া নয়; বরং নিশ্চিত আত্মঘাতী হওয়া।
গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির নবায়ন নিয়েও সামনে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এমন একটি সামরিক জোটে যোগ দিয়ে যদি প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক আরও জটিল হয়, তার মূল্য কেন ১৮ কোটি জনগণ দেবে? মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানোর পেছনে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক গুরুত্বও বড় কারণ। প্রায় ৪৫ লাখ বাংলাদেশি সৌদি আরবে কর্মরত; সৌদি আরব বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বাংলাদেশের বিপুল মুসলিম জনগোষ্ঠী জোটটির রাজনৈতিক ও প্রতীকী গুরুত্বও বাড়াবে বলে প্রচার করা হচ্ছে।
কিন্তু অন্যের প্রয়োজন আর নিজের প্রয়োজন এক জিনিস নয়। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের মাপকাঠি হওয়া উচিত প্রথমে নিরাপত্তা, তারপর সার্বভৌমত্ব, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতা। আমরা কি লক্ষ্য করিনি, মিসরও এই প্রশ্নে সতর্ক। চুক্তিতে যোগ দিলে আঞ্চলিক সংঘাতে নিজের নিরপেক্ষতার অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এই আশঙ্কা তাদের রয়েছে। তারা অপেক্ষা করছে। জোট বাস্তব সংকটে কী করে, সেটি দেখছে।
সুতরাং বাংলাদেশের উচিত প্রথমে মক্কা প্যাক্টের পূর্ণ পাঠ প্রকাশ্যে আনা।
সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ধারাটির (collective-defence clause) প্রকৃত অর্থ কী, চুক্তি থেকে সরে আসার সুযোগ কতটা, নিরপেক্ষ থাকার অধিকার থাকবে কি না—এসব বিষয় আগে স্পষ্ট করা দরকার। বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাত দেখা দিলে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে, সে বিষয়ে একটি লিখিত পরিস্থিতি-বিশ্লেষণ থাকা জরুরি। সেখানে বাংলাদেশের দায়িত্ব কী, তা অস্পষ্ট রেখে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া বিপজ্জনক।
বাংলাদেশ কারও শত্রু হতে চায় না। পাকিস্তানের নয়, ভারতের নয়, সৌদি আরবের নয়, তুরস্কের নয়, ইরানেরও নয়। বাংলাদেশের প্রয়োজন শান্তি, বাণিজ্য, পানি, জ্বালানি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ। আমাদের সৈন্য অন্যের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর চেয়ে নিজেদের সীমান্ত, অর্থনীতি ও নাগরিকের নিরাপত্তা শক্তিশালী করা অনেক বেশি জরুরি।
বন্ধুত্বের নামে যদি এমন কোনো চুক্তিতে ঢুকি, যেখানে বন্ধুর শত্রুও একদিন আমাদের শত্রু হয়ে যায়, তাহলে সেটি বন্ধুত্ব নয়—নিজেকে অন্যের সংঘাতের সঙ্গে বেঁধে ফেলা। বাংলাদেশের এই যুদ্ধের দায়বদ্ধতা নেওয়ার আগে একশবার ভাবতে হবে। মক্কা প্যাক্টের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই মুসলিম বিশ্বের ঐক্য নয়। প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের স্বার্থ কোথায়। বাংলাদেশ কি অন্যের নিরাপত্তা-সমীকরণের অংশ হবে, নাকি নিজের নিরাপত্তার হিসাব নিজেই করবে? বাংলাদেশের সেই বুদ্ধিটুকু যেন হারিয়ে না যায়। কোনো দুষ্টচক্রের ফাঁদে যেন না পড়ে।