শরতের রাত। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। একটি গ্রাম্য উঠান, মাদুরের ওপর শত শত মানুষ। অসংখ্য কৌতূহলী চোখের দৃষ্টি নিবদ্ধ কয়েকটি কুপি বাতির দিকে। কুপি বাতির পাশে গদিঘরের ক্যাশবাক্সের মতো একটি টুল।
৭০ বছর বয়সী জলিল নামে এক ব্যক্তি এসেছেন পুঁথি পাঠ শুনতে। বাঙালির হারিয়ে যাওয়া লোকজ ঐতিহ্যের অন্যতম অংশ পুঁথি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগ থেকে প্রায় ৩০০ বছর পেছনের গল্প এটি। যে সময়ে গ্রামের উঠানে মাদুর পেতে মানুষ শুনত কালু গাজী-চম্পাবতী, সোনাভান, নিজাম ডাকাতের পুঁথি।
বিভিন্ন এলাকা থেকে এই অজপাড়াগাঁয়ে এসেছেন আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা। শিশু, নারী-পুরুষ—সকলেই কিতাব প্রামাণিকের খোলা উঠানে জোছনার আলোয় মাদুরে গা ঘেঁষে বসেছেন। অনেকের চোখেমুখে কৌতূহলের ছাপ।
পাবনার চাটমোহরে হারিয়ে যাওয়া লোকজ সাহিত্য ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে পুঁথি পাঠের আসর বসেছিল বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাতে। উপজেলার বিলচলন ইউনিয়নের সোনাহারপাড়ায় কিতাব প্রামাণিকের বাড়ির উঠানে এ আয়োজন করা হয়।
পূর্ণিমার চাঁদ, কুপি ও হারিকেনের নিভু নিভু আলোয় নাট্যজন আসাদুজ্জামান দুলাল তাঁর মায়াবী সুরের জাদুতে ‘সোনাভান’ পুঁথি পাঠ করেন। উপস্থিত মানুষ শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে মনোযোগ দিয়ে শোনেন পুঁথি পাঠ। এছাড়া লইমুদ্দিন প্রামাণিক ও ওসমান সরদার পুঁথি পাঠ করেন।
পুঁথি পাঠ শুনতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত শব্দ প্রকৌশলী রিপন নাথ, চলচ্চিত্রকার নিয়ামুল মুক্তাসহ শুধু ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সাহিত্যপ্রেমী, সংস্কৃতিসেবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এসেছিলেন।
আয়োজকদের অন্যতম ডা. আতিকুর রহমান আতিক জানান, আবহমান গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া লোকজ সাহিত্য ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেই এই পুঁথি পাঠের আসরের আয়োজন করা হয়েছে।
এই আয়োজনকে সমৃদ্ধ করেন সজল বিশ্বাস, বিপ্লব আচার্য, প্রভাষক আব্দুল মান্নান, অম্লান ভট্টাচার্য, সৌরভ কুন্ডু, শুভ কর্মকারসহ মুক্তচিন্তার স্থানীয় মানুষ।
প্রসঙ্গত
উপমহাদেশে পুঁথি সাহিত্য শুরু হয়েছিল প্রায় আঠারো শতকে। আনুমানিক ১৬৮০-১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে হুগলির বালিয়া-হাফেজপুরের কবি ফকির গরীবুল্লাহ ‘আমীর হামজা’ রচনার মধ্য দিয়ে এই পুঁথি কাব্যধারার সূত্রপাত করেন। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, পুঁথির প্রায় ৩২ শতাংশ শব্দ ছিল বিদেশি। মধ্যযুগে প্রায় পাঁচশ বছর ধরে বাংলা ভাষায় যে সাহিত্যরীতি চলে আসছিল, তার থেকে পুঁথি সাহিত্য ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। ধারণা করা হয়, পুঁথি সাহিত্যের উৎস ছিল কলকাতা, হাওড়া, হুগলি ও চব্বিশ পরগনা অঞ্চলের মানুষের কথ্যভাষা।
গ্রামবাংলার খানকাঘর, খোলা উঠানে নতুন ধান ওঠার পর কিংবা শীতের রাতে পুঁথি পাঠের আসরে পাঠ করা হতো ‘আমীর হামজা’, ‘শাহনামা’, ‘আলেফ লায়লা’, ‘হাতেম তাই’, ‘কমলা সুন্দরী’, ‘দেলদার কুমার ও শাহজাদী দিল পিঞ্জির কিচ্ছা’, ‘জঙ্গনামা’, ‘আমি সওদাগর ও ভেলুয়া সুন্দরী’, ‘গাজীকালু ও চম্পাবতী কন্যা’, ‘তাজকিরাতুল আউলিয়া’, ‘কাসাসুল আম্বিয়া’, ‘বিবি সোনাভান’, ‘ফকির বিলাস’, ‘লাইলী-মজনু’ প্রভৃতি পুঁথি।
হানিফা, হামজা, হাতেম তাই, সোহরাব-রুস্তম, জৈগুন বিবি প্রমুখ বীর চরিত্র নিয়ে রচিত কাব্যগুলো বেশি জনপ্রিয় হয়েছিল। কালের বিবর্তন, আকাশ সংস্কৃতির ভয়াল গ্রাস এবং আধুনিকতার জাঁতাকলে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পুঁথি পাঠের আসর আজ বিলুপ্তির পথে।
আরএন