বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ক্রমেই সোনার মজুত বাড়াচ্ছে। তবে সেই সোনা সবসময় নিজ দেশের ভল্টে রাখা হচ্ছে না। নিরাপত্তা, তারল্য ও আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত লেনদেনের সুবিধার জন্য লন্ডন, নিউইয়র্কসহ বিশ্বের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক কেন্দ্রে সোনা সংরক্ষণ করছে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
একই সঙ্গে কোনো একটি দেশ বা প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে সোনার মজুত বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে রাখার প্রবণতাও বাড়ছে।
বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক ও আইনি ঝুঁকি কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের সোনার কাস্টডি বা সংরক্ষণব্যবস্থা আরও বৈচিত্র্যময় করছে।
সোনা রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যাংক অব ইংল্যান্ড
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের জরিপ অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ৫৭ শতাংশ তাদের সোনার কিছু অংশ ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে সংরক্ষণ করে। বিদেশে সোনা রাখার ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে জনপ্রিয় কেন্দ্র।
এরপর রয়েছে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ। জরিপে অংশ নেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ১৪ শতাংশ সেখানে কিছু সোনা সংরক্ষণ করে।
এ ছাড়া সুইজারল্যান্ডের ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টস (বিআইএস) এবং ফ্রান্সের বান্ক দ্য ফ্রঁসেও বিভিন্ন দেশের সোনা রাখা হয়। চীনও ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সোনা সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।
লন্ডন-নিউইয়র্কেই কেন সোনা রাখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক?
এর অন্যতম প্রধান কারণ তারল্য। লন্ডন ও নিউইয়র্ক বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও সোনা বাণিজ্যের কেন্দ্র। এসব শহরে সংরক্ষিত সোনার সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজার ও সোনা নিষ্পত্তি ব্যবস্থার সরাসরি সংযোগ রয়েছে।
ফলে প্রয়োজনের সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তুলনামূলক দ্রুত সেই সোনা আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবহার করতে পারে। সোনার বার নতুন করে পরীক্ষা বা প্রত্যয়ন করার প্রয়োজনও অনেক ক্ষেত্রে কমে যায়।
এ ছাড়া বিদেশি ভল্টে থাকা সোনার বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ডলারভিত্তিক তারল্য ব্যবস্থায় প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে। নিজেদের সোনা ইজারা দিয়েও আয় করার সুযোগ রয়েছে।
বিদেশে সোনা রাখার ঝুঁকিও আছে
বিদেশে সোনা সংরক্ষণের সুবিধার পাশাপাশি ঝুঁকিও রয়েছে। কোনো দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ বা নিষেধাজ্ঞা তৈরি হলে সেখানে রাখা সম্পদে প্রবেশাধিকার সীমিত হয়ে যেতে পারে। এমনকি মালিকানা অক্ষুণ্ন থাকলেও প্রয়োজনে সেই সম্পদ দ্রুত ব্যবহার করা সম্ভব নাও হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে ২০১৮ সালে ভেনেজুয়েলার সোনা নিয়ে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের সঙ্গে তৈরি হওয়া বিরোধকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে গোল্ডম্যান স্যাকস।
এ ধরনের ঘটনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সোনার মজুত একাধিক দেশ ও প্রতিষ্ঠানে রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
সব সোনা দেশে রাখলেও ঝুঁকি রয়েছে
নিজ দেশের ভল্টে সোনা রাখারও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। নিরাপত্তা, নিরীক্ষা ও বিমার জন্য বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়। পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হয়।
তাই একাধিক বিদেশি কাস্টডিয়ানের কাছে সোনা রাখলে কোনো একটি দেশ, প্রতিষ্ঠান বা আইনি ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমানো সম্ভব।
এক মাসেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ৫৭ টন সোনা কেনা
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা কেনার প্রবণতাও সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাবে, গত জুনে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মোট ৫৭ টন সোনা কিনেছে। ২০২২ সালের আগের দীর্ঘমেয়াদি মাসিক গড় ছিল প্রায় ১৭ টন।
জুনে শনাক্তযোগ্য ক্রেতাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিল চীন। ওই মাসে দেশটি ৪০ টন সোনা কিনেছে বলে জানিয়েছে গোল্ডম্যান স্যাকস।
তবে একই সময়ে লন্ডনে ৩২ টন মুদ্রা সোনা প্রবেশ করে। গোল্ডম্যান স্যাকসের ধারণা, এই প্রবাহ সরাসরি সোনা বিক্রির ইঙ্গিত নাও হতে পারে; বরং কোনো কোনো দেশের সোনার কাস্টডি স্থানান্তরের অংশ হিসেবেও এমনটি হতে পারে।
এর পক্ষে আরেকটি তথ্য তুলে ধরেছে প্রতিষ্ঠানটি। জুনে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে বিদেশি সরকারি সোনার মজুত ৯৮ টন বেড়েছে।
রাশিয়ার অভিজ্ঞতার পর বাড়ছে সতর্কতা
২০২২ সালে রাশিয়ার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বড় একটি অংশ আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় স্থগিত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নিজেদের রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে।
এর প্রভাব পড়েছে সোনার ক্ষেত্রেও। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা রাজনৈতিক সংঘাতের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন সোনার মজুত শুধু বাড়াচ্ছেই না, কোথায় এবং কীভাবে তা সংরক্ষণ করা হবে, সেটিও নতুন করে বিবেচনা করছে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ বৈচিত্র্যকরণের এই প্রবণতা আরও কয়েক বছর অব্যাহত থাকতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৫০ টন করে সোনা কেনার পূর্বাভাস দিয়েছে।
সূত্র: ইনভেস্টিং ডটকম
-টিএস