গ্যাস সংকটে নরসিংদীতে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক কারখানা। বন্ধ ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং কারখানাগুলোতে পচে নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার কেমিক্যাল মিশ্রিত কাপড়। কারখানা মালিকদের দাবি, গত এক মাসে এ ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা।
সরেজমিনে নরসিংদীর মাধবদীতে গিয়ে দেখা গেছে গ্যাসের গ্যাসের সংকটে ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং কারখানাগুলোতে শাড়ি, থ্রি পিস, গজ কাপড়, বেডশিটের কাপড়গুলো পচে নষ্ট হচ্ছে। পানিতে ভেজানো উৎপাদনের জন্য কেমিক্যাল দিয়ে প্রসেসিং করা গ্রে কাপড়গুলো ফ্লোরের মধ্যে পচে নষ্ট হচ্ছে। ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ।
বিভিন্ন কারখানার কারিগরদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কেমিক্যাল দিয়ে গ্রে কাপড় প্রসেসিং করলে ১৬ ঘণ্টার মধ্যেই প্রক্রিয়া শেষ করতে হয়। কোনো কোনো কারখানায় তিন থেকে চার দিন ধরে গ্যাসের চাপ শূন্য পিএসআই থাকায় মেশিনগুলো একেবারেই বন্ধ হয়ে আছে। ফলে কেমিক্যাল দিয়ে ভেজানো কোটি কোটি টাকার কাপড়গুলো পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে স্থানীয় বাজারে, বাড়ছে কাপড়ের দাম; অন্যদিকে রপ্তানি আদেশ বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে।
নরসিংদীর মাধবদী তিথি টেক্সটাইলের প্রোডাকশন ম্যানেজার শিহাবুল ইসলাম বলেন, দুই থেকে আড়াই লক্ষ গজ কাপড় বিভিন্ন কেমিক্যাল দিয়ে ভেজানো আছে প্রসেসিং করার জন্য। এগুলো ইতোমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। তারপর আমাদের বিভিন্ন দেশের বায়াররা (ক্রেতা) অলরেডি অর্ডার বাতিল করে দিচ্ছে। এদিকে কারখানার শ্রমিকদের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে, বেতন দিতে পারছি না। সব মিলিয়ে অবস্থা খুবই খারাপ। প্রতিদিন ফ্যাক্টরিতে এসে ঘুরে যাচ্ছি। ৪/৫ দিন ধরে একেবারেই গ্যাস নেই। সরকারের কাছে অনুরোধ গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করে যেন কাপড় শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখে।
শহরের চৌয়ালা এলাকার ভাই ভাই সাইজিং মিলে গিয়ে দেখা যায়, মাত্র দুজন কর্মচারী বসে আছেন। তারা জানান, কারখানা ছুটি হয়ে গেছে। কোনো কাজ নেই, তাই শ্রমিকদেরও বিদায় করে দেওয়া হয়েছে। কারখানার মালিক আতাউর রহমান মিঠু বলেন, ‘গ্যাসের চাপ একটুও নেই। শ্রমিকদের বসিয়ে রেখে বেতন কীভাবে দেব? তাই অনির্দিষ্টকালের জন্য শ্রমিকদের ছুটি দিয়েছি। বলে দিয়েছি, যেদিন গ্যাস পাব, সেদিন থেকে আবার কারখানা চালু হবে।’
নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রাশেদুল হাসান রিন্টু বলেন, ‘বিকল্প পদ্ধতিতেও কোনো কারখানা উৎপাদনে যেতে পারছে না। একের পর এক কারখানা বন্ধ করে শ্রমিকদের ছুটি দেওয়ার খবর পাচ্ছি। ভয়াবহ এক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে আমাদের নরসিংদীর শিল্প খাত।’
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) মুখপাত্র আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমরা জানতে পেরেছি আমাদের নরসিংদীতে গ্যাসের চাপ আছে। কিন্তু আমরা তিতাসে যোগাযোগ করার পর তারা বলছে, ঘোড়াশাল সারকারখানাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সেখানে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। শিল্প খাতকে সংকুচিত করা হয়েছে। এটা আমাদের জন্য দুঃসংবাদ। কারণ গ্যাস থাকার পরও আমরা এ শিল্পখাতে গ্যাস পাচ্ছি না। এতে আমাদের শিল্প খাতে দুর্বিষহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। আমরা শিল্প মালিকদের পক্ষ থেকে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ ও সরকারকে অনুরোধ করতে চাই, বাংলাদেশের প্রত্যেকটি সেক্টরকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। সারকারখানা ও বিদ্যুৎ সেক্টরকে যেভাবে বাঁচিয়ে রাখতে হবে, ঠিক একইভাবে শিল্প খাতকেও অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার।
শিল্পমালিকরা আরও বলছেন, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ এই সংকটের সময়ও সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচনায় সারের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া সার কারখানায় পূর্ণ মাত্রায় গ্যাস দিচ্ছে। সেখানে একটু সমন্বয় করতে পারলে নরসিংদীর গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলো রেশনিং করে হলেও চালিয়ে নেওয়া যেত। দেশের চাহিদার ৭০ শতাংশ কাপড় এই জেলা থেকে উৎপাদিত হয়।
তারা আরও বলেন, গ্যাসের এমন সমস্যা তারা ব্যবসায়িক জীবনেও সম্মুখীন হননি। শুধুমাত্র গত এক মাসে নরসিংদীর ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং কারখানাগুলোতে এক কোটি গজ কাপড় পচে নষ্ট হয়েছে। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় একশ কোটি টাকা।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন, নরসিংদীর ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাকসুদুর রহমান বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া সারকারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২০০ প্রেসারে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। সার কারখানায় গ্যাস দেওয়ার পর বাকি গ্যাস সিএনজি স্টেশন, কলকারখানা ও বাসাবাড়িতে সরবরাহ করা হয়। তবে আমরা আশা করছি দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
টিআইএস