১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের ১৮০ দিন পূর্ণ হয়েছে। নির্বাচনী অঙ্গীকার, প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং জনজীবনে স্বস্তি ফেরানোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল নতুন সরকার।
ছয় মাসের এই সময়ে সরকার বেশ কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত, আইন প্রণয়ন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, কর্মসংস্থান ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে মানুষের অসন্তোষ পুরোপুরি কাটেনি। ফলে ১৮০ দিনের মূল্যায়নে সরকারের চিত্র অনেকটাই ‘উদ্যোগ বেশি, বাস্তব ফলের অপেক্ষা’—এমন পর্যায়ে রয়েছে।
যেসব ক্ষেত্রে সাফল্য
অর্থনীতি স্থিতিশীল করার উদ্যোগ:
অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব বাড়ানো ও আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল করা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি। বাংলাদেশ ব্যাংকও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি অব্যাহত রেখেছে। ২০২৬ সালের মে মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসে, যা আগের তুলনায় কম।
তবে এই সাফল্যকে এখনও পুরোপুরি স্বস্তির জায়গা বলা যাচ্ছে না। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশে থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখনও উচ্চ।
সংস্কার ও নতুন আইন:
সরকারের ১৮০ দিনে জুয়া প্রতিরোধ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসহ বিভিন্ন আইন ও নীতিগত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপদ খাদ্য, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন, কার্বন ক্রেডিট এবং বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের মতো বিষয়েও কমিটি ও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নথিতেও নতুন কমিটি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা দেখা যায়।
অবকাঠামো ও উন্নয়ন পরিকল্পনা:
তিস্তা মহাপরিকল্পনা, ঢাকার জলপথে ওয়াটার বাস, সরকারি ভবনে সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন বড় প্রকল্প নিয়ে সরকার সক্রিয় হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বায়োটেকনোলজির মতো ভবিষ্যৎমুখী খাতেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
কূটনৈতিক তৎপরতা:
সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করেছে সরকার। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা মোকাবিলায় কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের পরিবেশ এখনও অনুকূল হয়নি বলে সরকার জানিয়েছে।
বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের ওপর গুরুত্ব:
সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তি খাত এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে জোর দিয়েছে। আইএমএফও রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
যেসব ক্ষেত্রে ব্যর্থতা বা বড় চ্যালেঞ্জ
দাম কমেনি, মানুষের স্বস্তি ফেরেনি:
সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষার জায়গা বাজারদর। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসেনি। গড় মূল্যস্ফীতি এখনও ৮ শতাংশের ওপরে। ফলে পরিসংখ্যানগত উন্নতির তুলনায় মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতায় স্বস্তি সীমিত।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট:
১৮০ দিনের অন্যতম বড় ব্যর্থতা হিসেবে জ্বালানি সংকট সামনে এসেছে। গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং ঘন ঘন লোডশেডিং জনজীবন ও শিল্প উৎপাদনে চাপ তৈরি করেছে। আগস্টে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বিদ্যুৎ ব্যবহারে আরও কড়াকড়ি আরোপ করেছে।
আইনশৃঙ্খলা ও ‘মব কালচার’:
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, গণপিটুনি ও মব-সৃষ্ট সহিংসতা সরকারের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। সরকারের পক্ষ থেকে ‘মব কালচার সহ্য করা হবে না’ বলে কঠোর অবস্থানের কথা জানানো হলেও বাস্তবে এমন ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। এতে রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের সংকট কাটেনি:
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে কঠিন অর্থনৈতিক উত্তরাধিকারগুলোর একটি। আইএমএফের সর্বশেষ মূল্যায়নেও বাংলাদেশের আর্থিক খাত, রাজস্ব ব্যবস্থা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছে। ব্যাংক খাত পুনর্গঠন এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর সমস্যা সমাধানে দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে আইএমএফ জানিয়েছে।
বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধিতে গতি এখনও দুর্বল:
সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির কথা বললেও অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি এখনও আসেনি। আইএমএফ ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। প্রয়োজনীয় সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে মধ্যমেয়াদে প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচেও নেমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে সংস্থাটি সতর্ক করেছে।
প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবায়নের ব্যবধান:
সরকারের ১৮০ দিনে ঘোষণা ও পরিকল্পনার সংখ্যা কম নয়। কিন্তু এসবের অনেকগুলোর দৃশ্যমান সুফল এখনও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। প্রশাসনিক সংস্কার, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও জনসেবার মানোন্নয়নে আরও দ্রুত বাস্তব ফল দেখানোর প্রয়োজন রয়েছে।
মূল্যায়নে যা দাঁড়ায়
১৮০ দিনে সরকারকে এক কথায় সফল বা ব্যর্থ বলা কঠিন। সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো—দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার, অর্থনীতি পুনর্গঠন, নতুন আইন ও উন্নয়ন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে একটি নতুন দিকনির্দেশনা তৈরি করা। অন্যদিকে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এসব উদ্যোগের অনেকগুলোর বাস্তব ফল এখনও দৃশ্যমান নয়।
অর্থনীতি নিয়ে আইএমএফের মূল্যায়নও বলছে, বাংলাদেশের সামনে বড় ধরনের আর্থিক ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, মূল্যস্ফীতি কমানো এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা এখন সরকারের জন্য অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন।
সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন সরকার ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে এক মতবিনিময় সভায় বলেন, মাত্র ছয় মাসে একটি সরকারের পক্ষে সব সমস্যার শতভাগ সমাধান করা কঠিন। তবে বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, দায়বদ্ধতা ও দায়িত্বশীলতা রয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার নিরলসভাবে কাজ করছে বলেও জানান তিনি। মাহদী আমিন বলেন, বিএনপির সুদৃঢ় রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তিতেই ইশতেহার প্রণীত হয়েছে। ভোটের পর হাতের কালি শুকানোর আগেই এর বাস্তবায়ন শুরু হয়। প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকেই কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যার ফলে প্রায় ১৩ লাখ কৃষক পরিবার সরাসরি উপকৃত হয়েছে।
এ বিষয়ে বিএনপির নবনিযুক্ত স্থায়ী কমিটির সদস্য রুহুল কবির রিজভী ডেইলি অবজারভারকে বলেন, সরকার অনেক কাজে সফল হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সফলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে একটি সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়নের জন্য ছয় মাস যথেষ্ট সময় নয়। প্রতি ছয় মাস অন্তর সরকারের কর্মযজ্ঞ পর্যালোচনা করা হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে জনগণের মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান করা সম্ভব হবে।
বিএনপির নবনিযুক্ত অপর স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার ডেইলি অবজারভারকে বলেন, দ্রব্যমূল্য এখন অনেকটাই সহনশীল। আর বিদ্যুৎ উৎপাদনের সাথে গ্যাসের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। যে এলএমজি কার্গ জাহাজ অকেজো হয়েছে। আমরা বিকল্প ব্যবস্থা করছি। বিগত অন্তবর্তীকালীন সরকার গ্যাসের অবাধ সরবরাহের কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আমরা বিকল্প ব্যবস্থা নিয়েছি। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা বললে বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার তাদের নিজস্ব দলীয় লোক পুলিশ প্রশাসনে নিয়োগ দেওয়ায় এগুলো হচ্ছে। আমরা পর্যায়ক্রমে তা ঠিক করবো। তবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে এখন অনেকটা ভালো।
সব মিলিয়ে সরকারের প্রথম ১৮০ দিনকে বলা যায় ‘ভিত্তি তৈরির সময়’। তবে আগামী ছয় মাসে পরিকল্পনার চেয়ে বাস্তবায়ন, ঘোষণার চেয়ে ফলাফল এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে জনজীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তনই সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার প্রধান মাপকাঠি হবে।
টিএস