ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
সরকারের ১৮০ দিন: কৃষককে সরকারি সহায়তা ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্ব
✎ তরিকুল ইসলাম সুমন
⏲ প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪৩ পিএম
সংগৃহীত ছবি
X

সংগৃহীত ছবি

বর্তমান সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম ১৮০ দিন আজ শেষ হয়েছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রণালয়গুলোকে সময় বেধেদিয়ে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের নির্দিশনা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরই ধারাবাহীকতায় কৃষি মন্ত্রণালয়ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করেছে। সরকারের নির্ধারিত সময়ে কৃষি খাতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে কৃষককে সরাসরি সরকারি সহায়তার আওতায় আনা, কৃষির অবকাঠামো উন্নয়ন, উৎপাদন বাড়ানো এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাপনা।

এরমধ্যে সরকার কৃষক কার্ড প্রবর্তন শুরু, কৃষকের ডাটাবেজ তৈরি, খাল খনন ও পুনঃখনন এবং বৃক্ষরোপণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। পাশাপাশি শস্যবীমার খসড়া, কীটনাশক ব্যবহারে মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতি কমানোর উদ্যোগ, সার নীতিমালা সংশোধন এবং উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদনে নতুন প্রকল্প চালু করেছে।


কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ১৮০ দিনের হিসাবে সবচেয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতির একটি খাল খনন ও পুনঃখনন। এ সময়ে ৪৭৮ দশমিক ৯ কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৪৭৫ দশমিক ৬১ কিলোমিটার খনন বা পুনঃখনন শেষ হয়েছে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৯ দশমিক ৩ শতাংশ অর্জিত হয়েছে।


অন্যদিকে কৃষক কার্ডের কার্যক্রম এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও এর আওতায় প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার কৃষকের তথ্যভান্ডার তৈরি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে সারাদেশের প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করে একটি সমন্বিত ডাটাবেজ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে মন্ত্রণালয় সুত্রে।


কৃষক কার্ডে ১২ লাখ ৫০ হাজার কৃষকের তথ্য: সরকারের অন্যতম বড় কৃষি উদ্যোগ ‘কৃষক কার্ড’। এর মাধ্যমে কৃষকদের একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডারে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। কৃষকের জমি, উৎপাদন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে কৃষি উপকরণ, কৃষি যন্ত্রপাতি, সেচ সুবিধা এবং বিভিন্ন ধরনের সরকারি সহায়তা সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।ইতোমধ্যে প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার কৃষকের তথ্যভান্ডার প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। আর প্রাক-পাইলট পর্যায়ে ২০ হাজার ৮৩২ জন কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়া হয়েছে। ক্রমান্বয়ে সারা দেশের সকল কৃষক এই কার্ডের আওতায় আসবেন।


খাল খননে প্রায় পুরো লক্ষ্যমাত্রা অর্জন: কৃষির জন্য সেচের পানি নিশ্চিত করা, জলাবদ্ধতা কমানো এবং পানি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে খাল খনন ও পুনঃখননকে গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। জাতীয় পর্যায়ে আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে কৃষি খাতে ৬ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম ১৮০ দিনের জন্য লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৭৮ দশমিক ৯ কিলোমিটার। এর বিপরীতে ইতোমধ্যে ৪৭৫ দশমিক ৬১ কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন সম্পন্ন হয়েছে। এতে ১৮০ দিনের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৯ দশমিক ৩ শতাংশ অর্জিত হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি কাজের গতি আরও বাড়াতে খাল খনন ও পুনঃখননের জন্য পৃথক একটি প্রকল্পও নেওয়া হয়েছে এ সময়ের মধ্যে।


এসব বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব নুরুজ্জামান বলেন, ১৮০ দিনে বেশিরভাগ উদ্যোগ বাস্তবায়ন পর্যায়ে, খাল খননে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় পুরোটাই অর্জন হয়েছে। এছাড়া চারা রোপনসহ কৃষকদের সহায়তায় আমরা নানা উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নিয়েছি।


ছয় মাসে ২৫ লাখ গাছের চারা রোপণ: কৃষির পাশাপাশি পরিবেশ ও জলবায়ুর বিষয়টিকেও অগ্রাধিকার কর্মসূচির মধ্যে রেখেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। প্রথম ছয় মাসে ২৫ লাখ গাছের চারা রোপণের যে লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছিল, তা পূরণ হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে পাঁচ বছরে মোট ৩ কোটি চারা রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।

কৃষি নীতিতে কয়েকটি পরিবর্তনের উদ্যোগ: ১৮০ দিনে কৃষি খাতের নীতিগত কাঠামোতেও কয়েকটি পরিবর্তন এসেছে। এর মধ্যে শস্যবীমার একটি খসড়া প্রস্তুতের কাজ শুরু হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোগবালাই বা অন্যান্য কারণে ফসলের ক্ষতি কমাতে কৃষকের আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া কীটনাশক ব্যবহারে মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর ক্ষতি কমানোর বিষয়েও নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য একটি পরামর্শক কমিটি গঠনের হচ্ছে, যারা নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং কৃষিপণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার কমানোর ক্ষেত্রে নীতি তৈরি করবেন।এ ছাড়া সার নীতিমালা সংশোধন করা হয়েছে। সার বিতরণ ও ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা এবং কৃষকের কাছে নির্ধারিত দামে সার পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে বর্তমান সরকার।


উত্তরাঞ্চলে উচ্চমূল্যের ফসল:  কৃষির বৈচিত্র্য বাড়াতে উত্তরাঞ্চলে উচ্চমূল্যের বা ‘হাই ভ্যালু ক্রপ’ উৎপাদনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য পৃথক হাই ভ্যালু ক্রপ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ধান ও প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি বেশি দামের সবজি, ফল ও অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদন বাড়াতে পারলে কৃষকের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য ফসলের বহুমুখীকরণ আয় ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

ঋণ মওকুফ ও কৃষি প্রণোদনা: কৃষকদের তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ কমাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের উদ্যোগও সরকারের কৃষি কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য শস্য, ফসল, পশুপালন ও মৎস্য খাতে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এ সরকার ক্ষমতায় আসার পরেই। তারই অংশ হিসেবে গত ৫ মাসে ৭ লাখের বেশি কৃষকের ৬০০ কোটি টাকার বেশি কৃষিঋণ মওকুফ করেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি)।

এর পাশাপাশি বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন বাড়াতে বীজ, সার ও অন্যান্য উপকরণে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে। পেঁয়াজ, মরিচ, আমন, গ্রীষ্মকালীন সবজি এবং অন্যান্য ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য এয়ারফ্লো মেশিন এবং সৌরবিদ্যুৎচালিত মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের অগ্রগতি হয়েছে এ সময়ে।


রপ্তানি বাড়ানোর প্রস্তুতি: কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিদেশের বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরিতেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই জায়গায় কৃষিপণ্য ওয়াশিং, প্যাকিং ও কোয়ারেন্টাইন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করা হলে রপ্তানিকারকদের সময় ও খরচ কমতে পারে। ইতিমধ্যে রপ্তানি বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ঢাকায় উদ্বোধন করা হয়েছে ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট (ভিএইচটি) প্ল্যান্ট, যেখানে কোনো ধরনের রাসায়নিক ছাড়া আন্তর্জাতিক মানের পণ্য শোধন করা যাচ্ছে। এদিকে সরকারের কার্যক্রম প্রসঙ্গে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, কৃষিখাতে সরকারের আন্তরিকতার প্রকাশ শুরু থেকেই দেখা গেছে। নতুন সরকার হিসেবে কৃষক সহায়তার কার্যক্রমগুলো সন্তোষজনক মনে হয়েছে। কথাটি এখন খুবই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে-সরকার জনগণের জন্য ভালো কাজ করতে চায়, এটি মানুষ অনুধাবন করছে। এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক। সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই ছোট কৃষকদের জন্য ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের সুদ ও আসল মওকুফ করেছে। এটি ছোট কৃষকদের জন্য বড় সহায়তা।


এছাড়া এ বছর কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ বাড়িয়ে ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৯ হাজার কোটি টাকা। এই ঋণ যদি সঠিকভাবে ও প্রকৃত কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা যায়, তাহলে তারা উপকৃত হবেন, কৃষকের পুঁজি সম্প্রসারিত হবে এবং সামগ্রিকভাবে কৃষির উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কৃষক কার্ড। ধাপে ধাপে চার বছরে এই কার্ড সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হবে এবং সব কৃষককে এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে যাঁরা কৃষক কার্ড পাচ্ছেন, তাদের মধ্যে উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। কারণ, কার্ডের মাধ্যমে তাঁরা নগদ সহায়তাসহ বিভিন্ন সরকারি সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এসবে সাধারণ কৃষকদের মধ্যে একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হচ্ছে—সরকার তাদের কথা ভাবছে এবং তাদের উৎসাহিত করার চেষ্টা করছে। এর মাধ্যমে কৃষকদের উৎপাদনে আরও উৎসাহিত করা সম্ভব হবে।


আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সেচব্যবস্থা। বর্তমানে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে অনেক এলাকায় পানি উত্তোলন নিয়ে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তাই ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তে সারফেস ওয়াটার বা ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে খাল খনন ও পুনঃখনন, নদী পুনঃখননসহ সরকারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চার বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী পুনঃখননের যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, সেটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে কৃষিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।




Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝