হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে টানা তিন দিন ধরে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় জেলার ছোট-বড় দেড় শতাধিক শিল্পকারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়েছে। গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকটেও অনেক কারখানা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে আছে। এতে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লোকসান গুনছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। একই সঙ্গে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
উৎপাদন বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক। ইতোমধ্যে অনেক কারখানায় শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হয়েছে। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বড় ধরনের ছাঁটাইয়ের আশঙ্কায় রয়েছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা।
স্কয়ার ডেনিম লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মাজেদ হোসেন বলেন, ‘গ্যাস-বিদ্যুৎ নেই। মেশিন বন্ধ। বেশি সময় বন্ধ থাকলে মেশিনগুলোও নষ্ট হতে পারে।’ তিনি জানান, তাদের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা একটি লাইনে ১ লাখ ২ হাজার ৫৯৭ ঘনমিটার এবং অপর লাইনে ৮৬ হাজার ২৮ ঘনমিটার। গত তিন দিন ধরে কোনো লাইনেই গ্যাস সরবরাহ নেই।
এসএম স্পিনিংয়ের মহাব্যবস্থাপক মো. আবুল বাশার বলেন, প্রতি মাসে তাদের ১০ লাখ ৩৫ হাজার ঘনমিটার গ্যাস প্রয়োজন, অর্থাৎ দৈনিক প্রায় ৩৪ হাজার ৫০০ ঘনমিটার। শুক্রবার সকালে ৬০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করা হলেও দুপুর ১২টার দিকে তা হঠাৎ কমে ২০ শতাংশে নেমে আসে।
তিনি বলেন, এ অবস্থায় মেশিন চালানো অত্যন্ত কঠিন। বারবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করলে অত্যাধুনিক মেশিন বিকল হয়ে যেতে পারে। এসব যন্ত্রপাতি নষ্ট হলে মেরামত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। গ্যাস সংকটের কারণে প্রতিনিয়ত ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে বলেও জানান তিনি।
আবুল বাশার আরও বলেন, ইতোমধ্যে রপ্তানি ১৩ শতাংশ কমে গেছে এবং বিভিন্ন কোম্পানির অর্ডার বাতিল হচ্ছে। শিল্পের সঙ্গে সরাসরি দেড় লাখ শ্রমিক যুক্ত থাকলেও পরোক্ষভাবে আরও কয়েক লাখ মানুষের জীবিকা এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দীর্ঘদিন শিল্পকারখানা বন্ধ থাকলে এর প্রভাব পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়বে।
সায়হাম গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী মো. রেজাউল হক জানান, শুক্রবার তাদের কারখানায় একেবারেই গ্যাস ছিল না। তবে শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হয়নি। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা, যাতে সরবরাহ শুরু হলেই দ্রুত মেশিন চালু করা যায়।
তিনি বলেন, গ্যাস না থাকা কিংবা বারবার সরবরাহ বন্ধ ও চালু হওয়ার কারণে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিছু যন্ত্রপাতি রয়েছে, যেগুলো নষ্ট হলে মেরামত করাও সম্ভব নয়।
জানা গেছে, হবিগঞ্জে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ১৭১টি শিল্পকারখানা রয়েছে। প্রায় ২০ দিন ধরে জেলায় গ্যাস সংকট চলছে। তবে বুধবার থেকে সরবরাহ একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। এতে অন্তত দেড় শতাধিক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কোনো কোনো কারখানায় কর্মচারীদের ছুটি দেওয়া হয়েছে। কারখানাগুলোতে নীরবতা বিরাজ করছে। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের হাজিরা ঠিক রাখা হয়েছে।
একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ফরাস দেবনাথ বলেন, কয়েক দিন ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকায় ঠিকমতো উৎপাদন হচ্ছিল না। এখন গ্যাস একেবারেই নেই। ফলে কারখানায় কাজ বন্ধ রয়েছে। শ্রমিক-কর্মচারীরা অলস সময় পার করছেন। এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।
নারী কর্মচারী শেফালী বেগম বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন কাজ করেই সংসার চালাই। কারখানা না চললে আমাদের কাজও বন্ধ, আয়ও বন্ধ। কতদিন এভাবে চলবে, সেটিও জানি না।’
এ বিষয়ে জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল করিম চৌধুরী বলেন, ‘সারা দেশের যা অবস্থা, আমাদেরও একই অবস্থা। কোনো উন্নতি নেই। আগের মতোই আছে।’
তিনি জানান, বৃহস্পতিবার রাতে কিছুটা গ্যাস সরবরাহ পাওয়া গেলেও কিছু সময় পর আবার আগের মতো বন্ধ হয়ে যায়। ১৫ আগস্ট থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কথা শোনা গেলেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের কিছু জানানো হয়নি।
তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু বিতরণ করি। গ্যাস নিয়ন্ত্রণ করে পেট্রোবাংলা।’