ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তিচুক্তির দুই দশকেরও বেশি সময় পার হলেও কাঙ্ক্ষিত ও পূর্ণাঙ্গ ভূমির অধিকার পাননি পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষেরা। আদিবাসী ফোরাম ও পাহাড়ের বিভিন্ন সূত্রের মতে, সাংবিধানিক স্বীকৃতির অভাব এবং অধিকারবঞ্চনার মধ্য দিয়ে কাটছে তাদের দৈনন্দিন জীবন। একসময়ের শান্ত পাহাড় আজ বিভিন্ন গোষ্ঠীর আধিপত্য ও সহিংসতার কারণে অস্থিতিশীল।
এমন এক প্রেক্ষাপটে আজ রোববার পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস-২০২৬। জাতিসংঘ নির্ধারিত এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য হলো—‘আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান : অধিকার এগিয়ে নেওয়া, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকরণ এবং আন্তঃপ্রজন্মের কল্যাণ প্রচার’।
পার্বত্য তিন জেলা—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তবে দীর্ঘ ২৮ বছর পেরিয়ে গেলেও পাহাড়বাসীর জীবনে কাঙ্ক্ষিত শান্তি, স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা আসেনি। দারিদ্র্য, ভূমিসংকট ও অনিশ্চয়তার মাঝেই জীবনযাপন করতে হচ্ছে সাধারণ বাসিন্দাদের।
অপেক্ষার প্রহর ও উদ্বাস্তুর জীবন
ভূমি সংক্রান্ত আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়ায় অন্যের জমিতে বা ভিটেমাটি হারিয়ে আশ্রয়হীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন অনেকেই। উদাহরণস্বরূপ, রাঙামাটির লংগদুর জ্ঞান লাল চাকমা ২০১৬ সালে খাগড়াছড়িতে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কার্যালয়ে নিজের ৫ একর বসতভিটা ফেরতের আবেদন করেছিলেন। কিন্তু সেই বিরোধ আজও নিষ্পত্তি না হওয়ায় নিজ ভিটেতে পুনর্বাসিতদের বসবাস দেখতে হচ্ছে তাকে, আর নিজে পরিবার নিয়ে বাঘাইছড়ির দেবাছড়ি গ্রামে অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন। একইভাবে খাগড়াছড়ির দীঘিনালার কৃষক ন্যালশন চাকমা ভারত থেকে নিজ ভূমে ফিরে এলেও নিজস্ব জমিতে ফিরতে পারেননি। পরিবার নিয়ে সাজেক ইউনিয়নের বাঘাইহাটে উদ্বাস্তুর মতো জীবন পার করছেন তিনি।
ভূমি কমিশন ও টাস্কফোর্সের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
পার্বত্য চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী ভূমিস্বত্ব নিশ্চিত করতে ১৯৯৯ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন করা হয়। আইন সংশোধনসংক্রান্ত জটিলতায় দীর্ঘ ১৬ বছর পেরিয়ে গেলেও কমিশনের কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলেনি। সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের সমন্বয়ে গঠিত এই কমিশনে ইতোমধ্যে পাঁচজন চেয়ারম্যান পরিবর্তন হয়েছেন এবং বর্তমানে ষষ্ঠ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মুহাম্মদ আব্দুল হাফিজ।
অন্যদিকে ভারতফেরত শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের চিহ্নিতকরণ এবং পুনর্বাসনের লক্ষ্যে গঠিত টাস্কফোর্স কমিটির কার্যক্রমও গতিহীন। বর্তমানে চেয়ারম্যান পদটি শূন্য রয়েছে; সর্বশেষ ষষ্ঠ চেয়ারম্যান সুদত্ত চাকমা চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগ করেন। ভারত থেকে ফিরে আসা প্রায় ৩৭ হাজার পরিবার রেশন পেলেও অনেকেই নিজেদের মূল ভিটেমাটি ফেরত পাননি। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসেবে তালিকাভুক্ত ৮০ হাজারের বেশি পরিবারের পুনর্বাসনও আটকে রয়েছে। টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য সন্তোষিত চাকমা বকুল জানান, ইতিপূর্বে ২৮টি বৈঠক হলেও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। তদুপরি বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া সহিংসতার কারণে নতুন করে অনেক পরিবার নিরাপত্তা হারিয়ে উদ্বাস্তু হলেও জমি ফেরত পাননি।
দিবসটি উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচি
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আজ রোববার সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে র্যালি, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য জগদীশ চন্দ্র বর্মণের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন মানবাধিকার কর্মী খুশী কবির, সংসদ সদস্য আন্না মিনজ, সাবেক সংসদ সদস্য ও পিসিজেএসএস সহসভাপতি উষাতন তালুকদার, অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, নাজমুল হক প্রধান, শাহীন আনাম ও শামসুল হুদা প্রমুখ।
এ ছাড়া খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানসহ চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, রাজশাহী, দিনাজপুর ও রংপুরের বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় পর্যায়ে শোভাযাত্রা, সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপন করা হচ্ছে।
এসএ