গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট সমাধান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে বলে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর মুক্তাঙ্গনে ১১-দলীয় ঐক্য আয়োজিত অবস্থান কর্মসূচিতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। জ্বালানি তেল ও গ্যাসের তীব্র সংকট, বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিল, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
কর্মসূচি থেকে ১০ দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—গত তিন মাসে আদায় করা সব ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের বিষয়ে অবিলম্বে গণশুনানির আয়োজন করতে হবে। দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রিপেইড ও পোস্টপেইড মিটারে ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া এবং অন্যান্য অযৌক্তিক ও অবৈধ চার্জ অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। গত তিন মাসে ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া ও অন্যান্য খাতে গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত আদায় করা অর্থ কোনো আবেদন ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত দিতে হবে।
বিদ্যুৎ বিলিং ব্যবস্থায় শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি পোস্টপেইড বিলের সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে মিটার রিডিং লগ সংযুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রিপেইড মিটারের ভেন্ডিং সফটওয়্যার ও বিলিং ব্যবস্থার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ অডিট পরিচালনা করতে হবে।
‘গ্যাস না থাকলে বিল নয়’—এই নীতি অবিলম্বে কার্যকর করতে হবে এবং সরবরাহহীন সময়ের জন্য কোনো বিল আদায় করা যাবে না। গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি ও আমদানিনির্ভরতা কমাতে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর জাতীয় জ্বালানি নীতি প্রণয়ন করে জরুরি ভিত্তিতে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও কূপ খননের উদ্যোগ নিতে হবে।
মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালের ব্যর্থতার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম এবং পুনরায় চালুর নির্দিষ্ট সময়সূচি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে বিকল্প জ্বালানি সরবরাহের কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য ব্যাকআপ পরিকল্পনা ঘোষণা করতে হবে।
গ্যাসের সিস্টেম লস, চুরি ও অপচয় বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। স্মার্ট মিটারিং চালু, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং পুরোনো পাইপলাইন দ্রুত সংস্কারের মাধ্যমে বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্র থেকেই অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
শিল্প, ব্যবসা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান রক্ষা করতে হবে। এলপিজি ও সিএনজির পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। জ্বালানিসংকটের কারণে শিল্পে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধে কার্যকর নজরদারি জোরদার করতে হবে এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস খাতে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে।
অবস্থান কর্মসূচি থেকে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির পাঁয়তারা বন্ধের দাবি জানান এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির পাঁয়তারা বন্ধ করতে হবে। গ্যাস নেই, বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিল দিতে হচ্ছে। এসব কারণে নারীরা রাস্তাঘাটে নেমে আসছেন, হাঁড়িপাতিল নিয়ে মিছিল করছেন।
তিনি বলেন, গণভোটের গণরায় যে সরকার মানে না, তারা জনগণের কোনো দাবিদাওয়া পূরণ করবে না। নির্বাচনের শুরু থেকেই সরকার যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, সেটি তারা পদে পদে করে যাবে। সরকারকে সেটি করতে দেওয়া যাবে না।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, ২০২৪ সালে বর্ষাবিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। প্রয়োজনে ২০২৬ সালেও হবে। সরকার পাঁচ মাসে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ দিতে পারছে না, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না। প্রতিশ্রুতি দিয়েও একটি কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি।
ক্যাম্পাসগুলোতে ক্ষমতাসীন ছাত্রদল নির্বিচারে ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা করছে বলে দাবি করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ছাত্রদল এখন পুরোনো কায়দায় ক্যাম্পাস দখলের পাঁয়তারা করছে। জুলাই যোদ্ধারা এখনো ক্যাম্পাসগুলোতে রয়েছেন। তারা যেন ক্যাম্পাসের দখলদারত্ব ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনকে না দেন, সেই আহ্বান জানান তিনি।
কর্মসূচিতে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ফখরুল ইসলাম, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির নায়েবে আমির মুখলেসুর রহমান কাসেমী, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম এবং ডিপিডিসি শ্রমিক কল্যাণ পরিষদের সভাপতি আনম বজলুর রহমান প্রমুখ।
এসএফ