রাশিয়ার পারমাণবিক শক্তিচালিত আইসব্রেকার ‘ফিফটি লেট পোবেডিতে চড়ে উত্তর মেরুতে এক বিরল বৈজ্ঞানিক অভিযানে অংশ নিয়েছে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. মালেকুল সালেহীন (প্রত্যয়)। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রসাটমের উদ্যোগে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক অভিযানে বিশ্বের আরও ২১টি দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে প্রত্যয়।
সম্প্রতি রাশিয়ার মুরমানস্ক শহরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ১০ দিনব্যাপী এই অভিযানের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। অভিযানে পারমাণবিক শক্তিচালিত আইসব্রেকারটির ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রুসলান সাসোভ। যাত্রাপথে অংশগ্রহণকারীরা ব্যারেন্টস সাগর অতিক্রম করে ভৌগোলিক উত্তর মেরু এবং ফ্রাঞ্জ জোসেফ ল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ ভ্রমণ শেষে আবার মুরমানস্কে ফিরে আসবেন।
মাল্টি-স্টেজ ‘আইসব্রেকার অব নলেজ’ প্রতিযোগিতার সপ্তম আসরের অন্যতম বিজয়ী হিসেবে প্রত্যয় এই বিরল সুযোগ অর্জন করেছে। বাংলাদেশ, ভারত, চীন, ব্রাজিল, কাজাখস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক ও ভিয়েতনামসহ ২২টি দেশের পাঁচ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল।
যাত্রার আগে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে প্রত্যয় বলেন, “এটি আমার জীবনের অত্যন্ত বিশেষ একটি দিন। আমি কখনো কল্পনাও করিনি যে একদিন উত্তর মেরুতে যাওয়ার সুযোগ পাব। বাংলাদেশ থেকে আর্কটিক অঞ্চলের দূরত্ব অনেক বেশি। এই অভিযান নিয়ে আমি ভীষণ উচ্ছ্বসিত। এমন একটি অসাধারণ অভিযানে নিজের দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে আমি গর্বিত।”
রসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ বলেন, “আর্কটিক এমন একটি স্থান, যেখানে সবচেয়ে উদ্ভাবনী ধারণার জন্ম হয়।” তিনি বলেন, এই অভিযান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সক্ষম তরুণ প্রতিভাদের একত্র করেছে। রাশিয়ার অনন্য পারমাণবিক শক্তিচালিত আইসব্রেকার বহর শিক্ষার্থীদের এমন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ দেয়, যা বিশ্বের অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। একই সঙ্গে এটি তাদের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি ও পরিবেশ সংরক্ষণে অবদান রাখতে অনুপ্রাণিত করে।
অভিযান চলাকালে অংশগ্রহণকারীরা পারমাণবিক শক্তিচালিত আইসব্রেকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন, আর্কটিকের প্রাকৃতিক পরিবেশ সম্পর্কে জানবেন এবং উত্তরাঞ্চলের নৌপরিবহনে পারমাণবিক প্রযুক্তির ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা লাভ করবেন। পাশাপাশি তারা পারমাণবিক বিজ্ঞান, সামুদ্রিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞদের লেকচার, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কর্মশালা, আলোচনা, ক্যারিয়ার গাইডেন্স সেশন এবং বিভিন্ন সৃজনশীল কার্যক্রমে অংশ নেবেন।
এই অভিযানের অন্যতম প্রতীকী আকর্ষণ হলো ভৌগোলিক উত্তর মেরুতে (৯০° উত্তর অক্ষাংশ) অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ দেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন।
প্রোগ্রামের বিশেষ অতিথি হিসেবে রয়েছেন রুশ বিজ্ঞান কল্পকাহিনির লেখক সের্গেই লুকিয়ানেঙ্কো। তিনি একটি যৌথ সৃজনশীল লেখালেখির কর্মশালা পরিচালনা করবেন। কর্মশালায় শিক্ষার্থীদের সম্মিলিতভাবে লেখা কল্পবিজ্ঞানের গল্পটি অভিযান শেষে প্রকাশ করা হবে।
‘আইসব্রেকার অব নলেজ’ প্রকল্পের লক্ষ্য বিশ্বজুড়ে তরুণ প্রতিভাদের খুঁজে বের করা এবং ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও পারমাণবিক শিক্ষা বিষয়ে আগ্রহ বৃদ্ধি করা। এ পর্যন্ত প্রকল্পটির আগের ছয়টি আসরের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৪০০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থীকে উত্তর মেরুতে শিক্ষামূলক অভিযানে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বের একমাত্র দেশ হিসেবে রাশিয়াই পারমাণবিক শক্তিচালিত আইসব্রেকার বহর পরিচালনা করে। রসাটমের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এফএসইউই অ্যাটমফ্লট পরিচালিত এই বহরে বর্তমানে আটটি পারমাণবিক শক্তিচালিত আইসব্রেকার রয়েছে। এগুলো নর্দার্ন সি রুটে নৌচলাচল নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পশ্চিম ইউরেশিয়া ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে এটি সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হিসেবে বিবেচিত।
-টিএস