ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
হামের জিনগত পরিবর্তন হয়নি, আক্রান্ত বেশি ৯ মাসের নিচে: আইসিডিডিআর’বি
✎ অবজারভার অনলাইন ডেস্ক
⏲ প্রকাশিত: রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬, ৯:২৬ পিএম
সংগৃহীত ছবি
X

সংগৃহীত ছবি

দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের ব্যাপকতা দেখে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছিলেন, হাম ভাইরাসে এমন কোনো জিনগত পরিবর্তন ঘটেছে কি না, যার কারণে টিকার কার্যকারিতা কমে গেছে। তবে, আইসিডিডিআর’বির একটি অনুসন্ধানের জিনগত পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা বর্তমানে ব্যবহৃত টিকার সুরক্ষা কমিয়ে দেতে পারে।

অনুসন্ধানে অন্তর্ভুক্ত সন্দেহভাজন রোগীদের মধ্যে সুপারিশকৃত দুই ডোজ টিকা পাওয়া শিশুদের পরীক্ষায় পজিটিভ হওয়ার হার তুলনামূলকভাবে কম ছিল। জিনগত বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসটি বি৩ জিনোটাইপ, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের হাম প্রাদুর্ভাবেও শনাক্ত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ২২ হাজার ৭৬৩ জন সন্দেহভাজন এবং পরীক্ষাগারে নিশ্চিত ১৫ হাজার ২৭২ হাম রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময়ে হামজনিত বলে সন্দেহ করা ৭২১টি এবং পরীক্ষায় ৯৫টি নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে।

আইসিডিডিআর’বি এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের গবেষকরা ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল থেকে ২১ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে সন্দেহভাজন হাম নিয়ে ভর্তি হওয়া ১৪ বছরের কম বয়সী ৩৪১ শিশুকে নিয়ে অনুসন্ধান চালান। পরীক্ষাগারে ৩২৪ শিশুর হাম নিশ্চিত হয়। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ছিল তিন থেকে আট মাস বয়সী শিশুরা। এই বয়সী ১৪১ শিশুর মধ্যে ১৩৭ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে।

টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার কম

গবেষকরা বয়স ও টিকা নেওয়ার ভিত্তিতে ৩৪১ শিশুকে চারটি দলে ভাগ করেন। নিয়মিত টিকা পাওয়ার বয়স হয়নি এমন ৯ মাসের কম বয়সী ১৪৬ শিশুর মধ্যে ১৪২ জনের, অর্থাৎ ৯৭ দশমিক ৩ শতাংশের হাম শনাক্ত হয়।টিকা নেওয়ার বয়স হলেও কোনো ডোজ না পাওয়া এমন ১২৬ শিশুর মধ্যে ১২২ জনের, অর্থাৎ ৯৭ শতাংশের হাম শনাক্ত হয়। এক ডোজ টিকা পাওয়া ৪৮ শিশুর মধ্যে ৪৪ জন বা ৯২ শতাংশ এবং সুপারিশকৃত দুই ডোজ টিকা পাওয়া ২১ শিশুর মধ্যে ১৬ জন বা ৭৬ শতাংশের হাম শনাক্ত হয়।

এর অর্থ এই নয় যে, পূর্ণ দুই ডোজ টিকা পাওয়া সব শিশুর ৭৬ শতাংশই হাম আক্রান্ত হচ্ছে। অনুসন্ধানে অংশ নেওয়া সব শিশুই সন্দেহভাজন হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। ৭৬ শতাংশের হিসাবটি শুধু এই হাসপাতালভিত্তিক অনুসন্ধানে অন্তর্ভুক্ত দুই ডোজ টিকা পাওয়া ২১ সন্দেহভাজন রোগীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

টিকার কোনো সুরক্ষা না থাকা শিশুদের মধ্যে পরীক্ষায় পজিটিভ হওয়ার হার প্রায় ৯৭ শতাংশ থেকে কমে দুই ডোজ পাওয়া শিশুদের মধ্যে ৭৬ শতাংশ হওয়া, টিকা সুরক্ষা দিচ্ছে এমন ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। হামে আক্রান্ত হয়নি এমন শিশুরা এই অনুসন্ধানে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তাই এই তথ্য থেকে টিকার সামগ্রিক কার্যকারিতার হার নির্ধারণ সম্ভব নয়। এই বিষয়ে আরও বড় পরিসরের গবেষণা প্রয়োজন।

মেলেনি টিকার অকার্যকারিতার প্রমাণ

আইসিডিডিআর’বির সংক্রামক রোগ বিভাগের ভাইরোলজি ল্যাবরেটরির সহযোগী বিজ্ঞানী ডা. নূরজাহান মালিহা বলেন, এই প্রাদুর্ভাবের ব্যাপকতা দেখে টিকা এখনো কার্যকর কি না, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। আমাদের অনুসন্ধানে ভাইরাসটি টিকার সুরক্ষা এড়িয়ে যাচ্ছে, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দুই ডোজ টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে পরীক্ষায় পজিটিভ হওয়ার হার কম ছিল। তবে হাসপাতালভিত্তিক এই অনুসন্ধান দিয়ে জনসংখ্যা পর্যায়ে টিকার কার্যকারিতার হার নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

দুই ডোজ টিকা পাওয়া ১৬ শিশুর হাম নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি আরও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। এর সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে থাকতে পারে, টিকা নেওয়ার পর কিছু শিশুর শরীরে যথেষ্ট শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি না হওয়া, সময়ের সঙ্গে অ্যান্টিবডির সুরক্ষা কমে যাওয়া, অপুষ্টি অথবা স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিভেদে অন্যান্য কারণ। তবে, এসব কারণের কোনটি সংক্রমণে ভূমিকা রেখেছে, তা নির্ধারণ করার বিষয়টি বর্তমান গবেষণার পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

ভাইরাসগুলোর জিনগত বিন্যাসের মধ্যে কতটা মিল রয়েছে এবং সেগুলো কীভাবে ছড়িয়ে থাকতে পারে, তা বুঝতে আইসিডিডিআর’বি ফাইলোজেনেটিক বিশ্লেষণ করেছে। এতে ৫৫টি পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মধ্যে ১৮টি নমুনা আইসিডিডিআর’বি এবং ৩৭টি নমুনা রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট বা আইইডিসিআর সিকোয়েন্স করেছে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সব ভাইরাসই বি৩ উপশাখার অন্তর্ভুক্ত (সাবক্লেড) এবং অন্যান্য দেশে শনাক্ত হওয়া বি৩ ভাইরাসের সঙ্গে এগুলোর মিল রয়েছে। গবেষকেরা ভাইরাসের এইচ (H) প্রোটিনের অ্যান্টিবডি শনাক্ত করতে পারে এমন অংশ বা এপিটোপ অঞ্চলে চারটি পরিবর্তন বা মিউটেশনও শনাক্ত করেছেন।

এইচ প্রোটিন ভাইরাসকে মানুষের কোষে প্রবেশ করতে সহায়তা করে এবং টিকার মাধ্যমে তৈরি অ্যান্টিবডির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য এটি। শনাক্ত হওয়া কয়েকটি মিউটেশন এর আগেও অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়া হাম ভাইরাসে পাওয়া গেছে। তবে, এসব মিউটেশন থাকার অর্থ এই নয় যে ভাইরাসটি প্রতিরোধে প্রচলিত টিকা আর কাজ করছে না।

হাম ভাইরাস এখনো একটি একক সেরোটাইপ হিসেবে রয়েছে এবং টিকার মাধ্যমে তৈরি অ্যান্টিবডি ভাইরাসটির একাধিক স্থান শনাক্ত করতে পারে। এসব মিউটেশন অ্যান্টিবডির সুরক্ষায় পরিমাপযোগ্য কোনো প্রভাব ফেলছে কি না, তা জানতে আরও পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন।

গবেষণার ফলাফল কম বয়সী শিশুদের একটি বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ সময়ের কথাও তুলে ধরেছে। বাংলাদেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় হাম-রুবেলা টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয় ৯ মাস এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাস বয়সে। প্রথম ডোজ টিকা পাওয়ার আগে শিশুরা আংশিকভাবে মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি এবং ব্যাপক টিকাদানের ফলে সমাজে তৈরি সামষ্টিক সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল থাকে।

প্রয়োজন আরও অনুসন্ধান

আইসিডিডিআর’বির আগের একটি গবেষণায় জন্মের পর থেকে অনুসরণ করা ১৬ জন মা ও শিশুর সংরক্ষিত নমুনার প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জন্মের পর প্রথম কয়েক মাসেই মায়ের কাছ থেকে পাওয়া হামের অ্যান্টিবডি দ্রুত কমে যায়। মূল্যায়ন করা এই শিশুদের তিন থেকে আট মাস বয়সে কোনো সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি শনাক্ত হয়নি। তবে, এই বিশ্লেষণে মাত্র ১৬ জন শিশু অন্তর্ভুক্ত ছিল। আরও বেশি শিশুর নমুনা ব্যবহার করে বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধান প্রয়োজন।

আইসিডিডিআর’বির সংক্রামক রোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, হাম প্রতিরোধ এবং গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি কমাতে টিকাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। একইসঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের হার তুলনামূলকভাবে বেশি বলে জানানো হলেও এই প্রাদুর্ভাব এত বড় হলো কেন, সেটিও আমাদের বুঝতে হবে।

প্রতিষ্ঠানটির ভাইরোলজি ল্যাবরেটরির সহকারী বিজ্ঞানী ড. কামরুন নাহার বলেন, শিশুরা কেন টিকা নিতে পারছে না এবং জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের যে হার জানানো হচ্ছে, তার আড়ালে কোনো কোনো এলাকায় রোগ প্রতিরোধক্ষমতার বড় ঘাটতি রয়েছে কি না, তা আমাদের নির্ধারণ করতে হবে। এসব গবেষণার তথ্য বাংলাদেশকে টিকাদান কৌশল আরও কার্যকর করতে এবং ভবিষ্যৎ প্রাদুর্ভাবে শিশুদের আরও ভালোভাবে সুরক্ষা দিতে সহায়তা করবে।

নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, এই প্রাথমিক ফলাফল কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। একই সঙ্গে এটি দেখিয়েছে যে, আমাদের আরও অনেক কিছু জানা প্রয়োজন। টিকা নেওয়া কিছু শিশু কেন আক্রান্ত হয়েছে, গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যুর পেছনে কোন বিষয়গুলো কাজ করছে, অপুষ্টি সুরক্ষাকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে এবং শিশুরা কখন মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি হারায়, তা অনুসন্ধানে আইসিডিডিআর,বি আরও বিস্তৃত গবেষণা কার্যক্রম হাতে নিচ্ছে।

বর্তমান প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় আইসিডিডিআর’বির গবেষকেরা চারটি প্রধান বিভাগীয় হাসপাতালে একটি ক্লিনিক্যাল কোহর্ট গবেষণা শুরু করেছেন। পাশাপাশি পরীক্ষাগারভিত্তিক ও জিনোমিক নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। জন্মের পর থেকে অনুসরণ করা শিশুদের নিয়ে বিস্তৃত রোগ প্রতিরোধ বিষয়ক গবেষণা, হামের প্রচলিত চিকিৎসার পাশাপাশি জিঙ্ক ব্যবহারের একটি পাইলট গবেষণা এবং শিশুরা কেন টিকা থেকে বাদ পড়ছে, তা জানতে কমিউনিটিভিত্তিক গবেষণাও শুরু হয়েছে।

গবেষকরা জোর দিয়ে বলেছেন, অভিভাবকদের টিকা দিতে দেরি করা বা টিকা এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। শিশুর বয়স অনুযায়ী প্রাপ্য হাম-রুবেলা টিকার সব ডোজ নিশ্চিত করতে হবে। প্রাদুর্ভাব চলাকালে টিকাদান বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা অনুসরণ করতে অভিভাবক ও পরিচর্যাকারীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

টিআইএস



Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝