ইলিশ মাছের মৌসুম শুরু হলেও নদীতে এখনও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে ইলিশ ধরা পড়ছে না। ফলে এই মাছ এখনো মূলত উচ্চবিত্তদের খাবারের টেবিলেই সীমাবদ্ধ। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে দেশের জাতীয় মাছ। অথচ ইলিশের চাষ, খাদ্য কিংবা উৎপাদনে কোনো খরচ হয় না। সরকারের ব্যয় হয় মূলত ইলিশের প্রাচুর্য রক্ষা ও সংরক্ষণে। মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর নাব্যতা সংকট, জাটকা ও মা ইলিশ নিধন, নদীর মোহনায় শিল্পায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই ইলিশের অপ্রাচুর্যতা দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ডিম ছাড়ার মৌসুমে সাগর থেকে নদীপথে উজানে উঠে আসে মা ইলিশ। ডিম ছাড়ার পর আবার সাগরে ফিরে যায়। সাগর থেকে নদী এবং নদী থেকে সাগরে ইলিশের এই চলাচলের পথ (মাইগ্রেটরি রুট) ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। কোটি কোটি টন পলি জমে এসব পথে সৃষ্টি হচ্ছে ডুবোচর। ফলে ইলিশের উজানে ওঠা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রজননও ব্যাহত হচ্ছে। এ কারণেই আগের মতো নদীতে ইলিশের দেখা মিলছে না। এই সংকট কাটাতে মেঘনা, তেঁতুলিয়াসহ বিভিন্ন নদীর মোহনা থেকে ডুবোচর অপসারণে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্যাহ বলেন, ‘ইলিশের চলাচলের জন্য কমপক্ষে ৫ থেকে ১০ মিটার গভীর পানি প্রয়োজন। কিন্তু মোহনার বিভিন্ন স্থানে পলি জমে পানির গভীরতা কোথাও কোথাও মাত্র ২ থেকে ৩ মিটারে নেমে এসেছে। এসব রুট খননের জন্য বিভিন্ন সময়ে আমরা সংশ্লিষ্ট দুটি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। তারা জানিয়েছে, শুধু মেঘনা নদীর ৫০ কিলোমিটার মোহনা এলাকায়ই কোটি কোটি ঘনমিটার পলি জমে আছে। এসব এলাকা ড্রেজিং করতে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে।’
তবে ড্রেজিংয়ের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও এখনো কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) করা হয়নি বলে জানান মোল্লা এমদাদুল্যাহ। এ সংকট সমাধানে সমন্বিত একটি প্রকল্প গ্রহণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সূত্র জানায়, ইলিশের জীবনচক্রে এখন অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নদীবক্ষে জেগে ওঠা অন্তত ২৫টি চর। বিশেষ করে চাঁদপুরের মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় গড়ে ওঠা এসব চরে প্রায় ৮৮ কোটি টন পলি জমেছে। যেখানে নদীর স্বাভাবিক গভীরতা ৫ থেকে ১০ মিটার (১৫ থেকে ৩০ ফুট) থাকার কথা, সেখানে পলি জমে অনেক স্থানে তা কমে মাত্র ২ থেকে ৩ মিটারে নেমে এসেছে।
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক বছর আগে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে নদীর মোহনার প্রায় ২০ কিলোমিটার অংশ খননের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
ইলিশের অপ্রাচুর্যতার কারণ সম্পর্কে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক, মৎস্য বিজ্ঞানী ও ইলিশ গবেষক ড. মো. আনিসুর রহমান বলেন, ‘শুধু ড্রেজিং করলেই হবে না। এর সুফল ও কুফল-দুই দিকই বিবেচনায় নিতে হবে। তা না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। ইলিশ গভীর সাগর থেকে ভোলার মেঘনা নদী দিয়ে প্রবেশ করে তেঁতুলিয়া, পদ্মাসহ দেশের বিভিন্ন নদীতে ছড়িয়ে পড়ে। দেশের মোট ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ৩৫ শতাংশই হয় ভোলায়। কিন্তু সাগর থেকে ভোলা উপকূলের মেঘনা নদীতে প্রবেশের সময় ডুবোচরে বাধার মুখে পড়লে ইলিশ দিক পরিবর্তন করে আবার সাগরের দিকে ফিরে যায়।
তিনি বলেন, শুধু বরিশালেই রয়েছে সাতটি নদীমোহনা। এসব মোহনা দিয়েই মূলত সাগর থেকে পদ্মা, মেঘনা ও দেশের অন্যান্য অভ্যন্তরীণ নদীতে প্রবেশ করে ইলিশ। সাগরের তুলনামূলক কম স্বাদের ইলিশ মিঠাপানির সংস্পর্শে এসে তার স্বাদ ও গুণগত বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এসব নদীমোহনায় অসংখ্য চর ও ডুবোচর জেগে ওঠায় ইলিশের ঝাঁক নদীতে প্রবেশে বাধার মুখে পড়ছে।
ড. আনিসুর রহমান আরও বলেন, ইলিশের চলাচলে আরেকটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নদীমোহনাকেন্দ্রিক শিল্পায়ন। বরগুনার তালতলীতে নির্মিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য তিন নদী-বিষখালী, বলেশ্বর ও পায়রার মোহনা থেকে লাখ লাখ টন বালু উত্তোলন করা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিয়মিত কয়লাবাহী জাহাজের চলাচল এবং কেন্দ্র চালুর সময় সৃষ্ট কম্পনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নদীর ইকোসিস্টেম। প্রায় একই ধরনের প্রভাব পড়েছে বুড়াগৌরাঙ্গ ও আগুনমুখা নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষেত্রেও। ইলিশ যদি তার স্বাভাবিক বিচরণপথে বাধার সম্মুখীন হয়, তাহলে মিঠাপানির নদ-নদী ইলিশশূন্য হয়ে পড়াই স্বাভাবিক।
সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, ইলিশ সম্পদ সংরক্ষণ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে দীর্ঘমেয়াদি ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ইলিশের নিরাপদ বিচরণ ও প্রজনন নিশ্চিত করতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ এবং পানির গুণগত মান বজায় রাখা জরুরি। একই সঙ্গে শিল্পবর্জ্য ও বিষাক্ত পদার্থের নদীতে নিঃসরণ বন্ধে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, ইলিশ সম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় গবেষক, বিশেষজ্ঞ এবং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ উপদেষ্টা দল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতেই ভবিষ্যতের নীতি ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেছেন, বাংলাদেশের খাদ্যতালিকায় ইলিশের অবস্থান সর্বোচ্চ। বিশ্বের মোট ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই বাংলাদেশে হয়। ফলে বাংলাদেশের ইলিশের প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে টিকে থাকতে হলে জ্ঞান, উদ্ভাবন ও গবেষণায় আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। ইলিশ সম্পদ সংরক্ষণ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং টেকসই ব্যবস্থাপনায় গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় জমে থাকা পলি অপসারণ এবং প্রয়োজনীয় ড্রেজিংয়ের জন্য গত বছরের ৯ জুলাই পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে ইলিশের প্রজনন ও অভিবাসনপথ (মাইগ্রেটরি রুট) সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ড্রেজিংয়ের বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএকে পাঠানো চিঠিতে ইলিশের চারটি গুরুত্বপূর্ণ মাইগ্রেটরি রুট চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে মেঘনা নদীর মোহনা এলাকায়-ভোলা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও পটুয়াখালী জেলার চরফ্যাশন, রাঙাবালী, হাতিয়া এবং সন্দ্বীপ উপজেলার সোনার চরসংলগ্ন এলাকায় ২ কিলোমিটার প্রশস্ত করে ২০ কিলোমিটার নদীপথ ড্রেজিংয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এসব পথ দিয়েই দেশের অভ্যন্তরে ডিম ছাড়ার জন্য প্রায় ৫০ শতাংশ ইলিশ প্রবেশ করে।
বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, এ এলাকায় ২০ কিলোমিটার নদীপথ ৭ মিটার গভীর করে খনন করতে প্রায় ৪ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এতে প্রায় ৪৭ কোটি ৬০ লাখ টন পলি অপসারণ করতে হবে। (হিসাব অনুযায়ী, ১ ঘনমিটার পলির ওজন ১ দশমিক ৭ টন এবং প্রতি ঘনমিটার ড্রেজিং ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭০ টাকা।)
একইভাবে তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় পটুয়াখালীর রাঙাবালী উপজেলার চর হেয়ার (স্থানীয়ভাবে কলাগাছিয়া নামে পরিচিত) এলাকায় ২ কিলোমিটার প্রশস্ত করে ১০ কিলোমিটার ড্রেজিংয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা এবং অপসারণ করতে হবে প্রায় ২৩ কোটি ৮০ লাখ টন পলি।
এ ছাড়া পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার আন্ধারমানিক নদীর মোহনায় ৭০০ মিটার প্রশস্ত করে ১০ কিলোমিটার নদীপথ খননের প্রস্তাব রয়েছে। এ কাজে ব্যয় হবে প্রায় ৮৩৩ কোটি টাকা এবং অপসারণ করতে হবে প্রায় ৮ কোটি ৩৩ লাখ টন পলি।
সবশেষে বরিশাল, চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুর জেলার হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জ, হাইমচর ও রায়পুর উপজেলার মেঘনা নদীর অংশে ৭০০ মিটার প্রশস্ত করে ১০ কিলোমিটার খননের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ প্রকল্পেও ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮৩৩ কোটি টাকা এবং অপসারণ করতে হবে প্রায় ৮ কোটি ৩৩ লাখ টন পলি।
তবে নদী গবেষকদের মতে, শুধু একবার খনন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। তাদের ভাষ্য, ‘মেঘনা নদী খননের পর আগের অবস্থায় ফিরতে প্রায় দুই বছর এবং তেঁতুলিয়া নদীর ক্ষেত্রে পাঁচ বছর সময় লাগে। তাই একবার ড্রেজিং করে রেখে দিলে হবে না। প্রতিবছর সংরক্ষণমূলক ড্রেজিং চালিয়ে যেতে হবে। অন্যথায় নদী খননের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে না।’
এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর প্রধান প্রকৌশলী (ড্রেজিং) মো. রকিবুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ‘আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো নৌযান চলাচলের জন্য নাব্যতা বজায় রাখা। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মাইগ্রেটরি রুট ড্রেজিংয়ের বিষয়টি নিয়ে আমরা একটি আলোচনা সভা করেছি। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এসব নদীর চরিত্র দেশের অন্যান্য নদীর তুলনায় ভিন্ন। এখানে সিল্টেশন অনেক বেশি হয় এবং খুব দ্রুত নদী ভরাট হয়ে যায়। তাই শুধু ড্রেজিং করলেই হবে না, সারা বছর সংরক্ষণমূলক ড্রেজিং চালিয়ে যেতে হবে। এ জন্য জাতীয় বাজেটেও প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, কেবল ড্রেজিং করে এ পথ দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করা সম্ভব নাও হতে পারে। এ কারণে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক শবে বরাত সরকার বলেন, ‘চাঁদপুর মাছঘাটে গত কয়েক দিন ধরে প্রতিদিন মাত্র ১০ থেকে ১৫ মণ ইলিশ আসছে। এই বাজারের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ একেবারেই নগণ্য। ইলিশের সংকটের কারণে আড়তগুলো প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে। সরবরাহ কম থাকায় দামও বেশি। ফলে বাজারে ক্রেতার উপস্থিতিও কমে গেছে। ইলিশের সরবরাহ বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই দাম কমে আসবে।’
পিরোজপুর জেলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি কমল দাস অভিযোগ করেন, ‘নিষেধাজ্ঞার সময়ও কিছু ট্রলারে মাছ ধরার কারণে বিপুল পরিমাণ মাছের রেণু ও পোনা নষ্ট হচ্ছে। এতে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। ফলে জেলেরা এখন আর আগের মতো কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ মাছ পাচ্ছেন না। পাশাপাশি মাছের আকারও আগের তুলনায় অনেক ছোট হয়ে গেছে।’
-টিএস