ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 রবিবার, ২ আগস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
ঢাবি-সংক্রান্ত ২২ গবেষণাপত্র প্রত্যাহার
বিশ্বমানের গবেষকের বিরুদ্ধে ‘পেপার মিল’ নেটওয়ার্কের অভিযোগ
✎ নাইমুর রহমান ইমন
⏲ প্রকাশিত: রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬, ৯:২৪ এএম আপডেট: ০২.০৮.২০২৬ ৯:৪৪ এএম
সংগৃহীত ছবি
X

সংগৃহীত ছবি

গবেষণায় জালিয়াতি ও ‘পেপার মিল’ নেটওয়ার্কে সম্পৃক্ততাসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) নাম প্রোফাইলে উল্লিখিত এমন ২২টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করেছে বিশ্বের একাধিক স্বনামধন্য জার্নাল। 

বিশ্বব্যাপী প্রত্যাহার হওয়া গবেষণাপত্রের তথ্যভান্ডার ‘রিট্র্যাকশন ওয়াচ’ ডেটাবেইজে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এসব রেকর্ড সংরক্ষিত হচ্ছে। সম্প্রতি প্রত্যাহারের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরে চিহ্নিত হওয়া গবেষণাপত্রও রয়েছে। ডেটাবেইজে থাকা মোট ৭১,৪৯৬টি রেকর্ডের মধ্যে ২২টি প্রত্যাহারকৃত গবেষণাপত্রের অন্তত একজন লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত।

এর মধ্যে রয়েছেন ঢাবির ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগের বিশ্বমানের এক গবেষক সৈকত মিত্র (বৈশ্বিক অবস্থান-১,৩৫,৫২০)। তিনি এবং রিসার্চ লার্নিং সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল ইসলাম চারটি করে প্রত্যাহারকৃত পত্রের সঙ্গে জড়িত। বায়োমেডিসিন অ্যান্ড ফার্মাকোথেরাপি এবং কেমোস্ফিয়ারের মতো জার্নালে প্রকাশিত ঐসব গবেষণা পত্রের বিরুদ্ধে পিআর রিভিউ প্রক্রিয়ায় কারসাজি ও অবিশ্বাসযোগ্য ফলাফলের কথা উল্লেখ করা হয়।

শনিবার প্রো-ভিসি (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম দ্য ডেইলি অবজারভারকে বলেন, গবেষণায় অনিয়ম ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে।

তবে রিট্র্যাকশন ওয়াচ ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এই একাডেমিক অনিয়মের এক জটিল জাল দেশজুড়ে বিস্তৃত। এতে প্লেজিয়ারিজম থেকে শুরু করে পরিশীলিত কম্পিউটার-উৎপাদিত বিষয়বস্তু ব্যবহার করাসহ নানা ধরনের অনিয়মের নজির রয়েছে।

২২টি প্রত্যাহারকৃত গবেষণাপত্রের মধ্যে ৬টিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একমাত্র বা প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশে ‘গ্রিনওয়াশিং’ নিয়ে একটি উচ্চপ্রোফাইল গবেষণা, যা ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ এবং সন্দেহভাজন পেপার মিল নেটওয়ার্কের সম্পৃক্ততার অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয়। Fe₂O₃ ন্যানোকণিকা নিয়ে একটি পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণাপত্র চলতি বছরের মার্চে চিত্র অনুলিপির অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয়। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূতত্ত্ববিষয়ক আরও কয়েকটি গবেষণাপত্রে জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ায় সেগুলোও প্রত্যাহার করা হয়েছে।

দ্য ডেইলি অবজারভারের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত একদল গবেষকের নাম একাধিক প্রত্যাহারকৃত গবেষণাপত্রে বারবার এসেছে। তালিকার শীর্ষে রয়েছেন সৈকত মিত্র ও তালহা বিন এমরান। তাদের প্রকাশিত গবেষণাপত্রে একজন গবেষকের (সৈকত মিত্র) প্রোফাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্তি উল্লেখ রয়েছে। তাদের নাম চারটি প্রত্যাহারকৃত গবেষণাপত্রে পাওয়া গেছে। তাদের পরেই রয়েছেন ফাহাদ আ. আলহুমাইদি, ফাহাদুল ইসলাম ও মো. রেজাউল ইসলাম, যাদের প্রত্যেকের নাম তিনটি প্রত্যাহারকৃত গবেষণাপত্রে পাওয়া গেছে।

এই নেটওয়ার্কে আরও আছেন মো. মোহাইমেনুল ইসলাম, আকলিমা আক্তার, আতকিয়া ফারজানা খান মীম, মোহাম্মদ আবদুল মাজিদ, মোহাম্মদ হ. নাফাদি, আমির খুসরো, আজিজ এফতেখারি, ফাতেমে করিমি ও মেহদি বাগায়েরির। তাদের প্রত্যেকের নাম দুইটি প্রত্যাহারকৃত গবেষণাপত্রে রয়েছে। এসব গবেষকের নাম একই গবেষণাপত্রে, বিশেষ করে ‘পেপার মিল’ নেটওয়ার্ক এবং পিয়ার রিভিউ প্রক্রিয়ায় কারসাজির অভিযোগে প্রত্যাহার হওয়া গবেষণাপত্রে সহলেখক হিসেবে দেখা যায়।

বাকি ১৬টি গবেষণাপত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্তি উল্লেখ থাকা গবেষকদের সহ-লেখক হিসেবে পাওয়া গেছে। এসব গবেষণায় তারা আন্তর্জাতিক গবেষকদের সঙ্গে কাজ করেছেন। ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে হওয়া প্রত্যাহারের ধারাবাহিকতা লেখকদের ঘনিষ্ঠ নেটওয়ার্কেরই ইঙ্গিত দেয়।

অধ্যাপক সালাম জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক সিন্ডিকেট ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নিচ্ছে। আমাদের সর্বশেষ সিন্ডিকেট সভায় এমন বিষয়ে একজনকে একাডেমিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ তদন্তে নিয়মিত কমিটি গঠন করা হয়। যদি গবেষণায় জালিয়াতি প্রমাণিত হয় তবে আমরা আমাদের বিধি যা বলে তাই করি।

বর্তমানে আলোচিত দর্শন বিভাগের অধ্যাপক রেবেকা সুলতানার বিরুদ্ধে পাওয়া গবেষণায় জালিয়াতির  অভিযোগকে অধ্যাপক সালাম উল্লেখ করে বলেন যে তার কাজে ২০%-এর বেশি প্লেজিয়ারিজমের অভিযোগ নিয়ে পূর্ববর্তী প্রশাসন রায় জানায়। তবে বর্তমান প্রশাসনের কাছে নতুন অভিযোগ দায়ের হলে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার প্রস্তুতি নেওয়া হবে।

প্রো-ভিসি (একাডেমিক) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান মানদণ্ড ও আন্তর্জাতিক প্রকাশনা নীতির মধ্যে একটি কারিগরি পার্থক্যের দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্লেজিয়ারিজম শনাক্তের ক্ষেত্রে বর্তমানে টানা ১৪টি শব্দের মিলকে গ্রহণযোগ্য ধরা হয়। তবে অনেক আন্তর্জাতিক জার্নাল টানা তিনটি শব্দের মিল পেলেও সতর্কতা জারি করে।

অধ্যাপক সালাম বলেন, নির্দিষ্ট গাণিতিক সমীকরণ বা প্রচলিত কারিগরি পরিভাষা মূল্যায়নের বাইরে রাখার মতো বিষয়গুলোও এ ধরনের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ব্যক্তিগত অনিয়মের বাইরে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বাংলাদেশের বৈশ্বিক একাডেমিক সুনামের ক্ষতির আশঙ্কার কথাও তুলে ধরছে। এ বিষয়ে অধ্যাপক সালাম বলেন, “পক্ষপাতের কারণে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের গবেষণাপত্র অনেক সময়ই ভালো জার্নালে প্রকাশের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। বর্তমান বিতর্ক সেই সন্দেহকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। যখন তারা আমাদের মতো একটি দেশের গবেষণা দেখে, তখন অনেকেই আমাদের তথ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলে। যদি তাদের ধারণা হয় যে এখানে অনেকেই প্লেজিয়ারিজম করে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, তাহলে আমাদের প্রতি আস্থার সংকট আরও গভীর হবে। একই সঙ্গে কিছু জার্নালও পর্যাপ্ত মান নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই গবেষণাপত্র প্রকাশ করছে। আমরা বড় সংকটের মধ্যে আছি। তাই এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাবি প্রশাসন বিদ্যমান নিয়মকে যথেষ্ট বলে দাবি করলেও, পেপার মিল নেটওয়ার্কের বিস্তার এবং ২২টি গবেষণাপত্রে ১৩৩ জন লেখকের সম্পৃক্ততা দেখে বুঝা যায় যে এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ, যার সমাধানে শুধু কমিটির তদন্ত যথেষ্ট নাও হতে পারে।

উল্লেখ্য, অধিকাংশ একাডেমিক প্রকাশক ‘কমিটি অন পাবলিকেশন এথিকস’ (কোপ)-এর নির্দেশিকা অনুসরণ করে গবেষণায় অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে। প্রথমে এডিটর অভিযোগের প্রাথমিক মূল্যায়ন করেন এবং সংশ্লিষ্ট লেখকদের কাছে ব্যাখ্যা চান। অভিযোগের সত্যতা নিয়ে উদ্বেগ থাকলে পরবর্তী তদন্ত করা হয়। গুরুতর অনিয়ম প্রমাণিত হলে গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়। এ ধরনের প্রত্যাহারের তথ্য ‘রিট্র্যাকশন ওয়াচ’ ওয়েবসাইটে সংরক্ষণ করা হয়। বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট প্রত্যাহারকৃত গবেষণাপত্র শনাক্ত করতে এই ডাটাবেজ ব্যবহার করা হয়েছে।

এসএ


Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝