বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের কিস্তি, শ্রমিকের মজুরি, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় আলু সংরক্ষণের হিমাগার পরিচালনা করা আর ‘সম্ভব হচ্ছে না’ বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন।
রাজধানীতে শনিবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু হিমাগার মালিকদের তরফে এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, আলু উৎপাদনে টানা দুই বছর উদ্বৃত্ত থাকলেও কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার শিল্প এখন গভীর আর্থিক সংকটের মুখে বলেও দাবি করেছে মালিকদের এ সংগঠনটি।
তাদের ভাষ্য, ২০২৫ সালে সরকার প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণের সর্বোচ্চ ভাড়া ৬ টাকা ৭৫ পয়সা নির্ধারণ করলেও চলতি বছরে ব্যয় আরও বেড়েছে। প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণে খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৭ টাকা ১১ পয়সা।
“কিন্তু সেই ভাড়া অপরিবর্তিত থাকায় অধিকাংশ হিমাগার লোকসানের মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অনেক হিমাগার পরিচালনা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা কৃষক, ব্যবসায়ী ও দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।”
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আলু বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কৃষিপণ্য। রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, মুন্সিগঞ্জ, চাঁদপুর, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আলুর ব্যাপক উৎপাদন হয় এবং এসব এলাকাকেন্দ্রিকভাবেই অধিকাংশ হিমাগার গড়ে উঠেছে। গেল বছর দেশে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয়, যা দেশের চাহিদার তুলনায় প্রায় ২৫ লাখ মেট্রিক টন বেশি দাবি করে সম্মেলনে বলা হয়, ওই বছর দেশের ৩৫১টি হিমাগারে প্রায় ৩৪ লাখ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করা হয়।
“তবে অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে অনেক কৃষক ন্যায্যমূল্য পাননি এবং উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হন। চলতি বছরও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।”
সংগঠনটির তথ্য বলছে, চলতি বছরে দেশে প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয়েছে, যা দেশের চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখ মেট্রিক টন বেশি। এ বছরও ৩৫১টি হিমাগারে প্রায় ৩৪ লাখ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে।
চলতি বছর ১ জুন থেকে হিমাগার শিল্পে ব্যবহৃত বিদ্যুতের বাণিজ্যিক ট্যারিফ ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি করার পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, অ্যামোনিয়া গ্যাস, লুব্রিকেন্ট, যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বেড়েছে দাবি করে মোস্তফা আজাদ চৌধুরী অভিযোগ করেন, “কিন্তু এসব ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে ভাড়া সমন্বয় করা হয়নি।”
বর্তমানে কেমন খরচ হয়, তার তথ্য তুলে ধরে দাবি করা হয়, একটি ১০ হাজার টন ধারণক্ষমতার হিমাগারে ব্যাংক ঋণের সুদ ও কিস্তি এবং বিদ্যুৎ ব্যয় মিলিয়ে প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণে খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৭ টাকা ১১ পয়সা।
এর সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, অ্যামোনিয়া গ্যাস, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ, লুব্রিকেন্টসহ অন্যান্য পরিচালন ব্যয় যোগ করলে প্রকৃত ব্যয় দাঁড়ায় প্রতি কেজিতে প্রায় ৯ টাকা ৬২ পয়সা।
অথচ সরকার নির্ধারিত ভাড়া ৬ টাকা ৭৫ পয়সা হওয়ায় অধিকাংশ হিমাগার লোকসান গুনছে।
সংগঠনটির ভাষ্য, এই অবস্থায় অনেক মালিক নিয়মিত ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। ফলে তারা ঋণখেলাপির ঝুঁকিতে পড়ছেন।
এ পরিস্থিতিতে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের কাছে ছয়টি দাবি তুলে ধরা হয় সংগঠনের তরফে-
ক্ষতিগ্রস্ত আলুচাষীদের জন্য প্রণোদনা প্রদান।
ব্যক্তিমালিকানাধীন হিমাগারকে কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসেবে বিশেষ সুবিধা প্রদান।
হিমাগারের বিদ্যুৎ বিলের ওপর ২০ শতাংশ রিবেট দেওয়া।
কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করা।
উদ্বৃত্ত আলু রপ্তানিতে বিদ্যমান ১০ শতাংশের পরিবর্তে ৩০ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া।
ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধে মৌসুমি বাস্তবতা বিবেচনায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ।
টিআইএস