ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬, ১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
দেশের বাইরে সার্ভার থাকায় অভিযোগ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা
উবারের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়, মিলছে না প্রতিকার
✎ অবজারভার অনলাইন ডেস্ক
⏲ প্রকাশিত: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৩৯ এএম
X

‘রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা-২০১৭’-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ায় দিন দিন বাড়ছে যাত্রী হয়রানি। বিশেষ করে উবারের বিরুদ্ধে সেবার মান, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, রাইড বাতিল এবং অভিযোগ নিষ্পত্তিতে গড়িমসিসহ নানা অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তবে অভিযোগ করেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিকার না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়ছেন যাত্রীরা।

ব্যবহারকারীদের অভিযোগ অনুযায়ী, অপছন্দের গন্তব্য হলে অনেক চালক রাইড বাতিল করে দেন। আবার অ্যাপে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি অর্থ দাবি, নির্ধারিত স্থানে না এসে যাত্রীকে অপেক্ষায় রাখা, চালকের পরিবর্তে যাত্রীকে রাইড বাতিল করতে বাধ্য করা, পিক আওয়ার, বৃষ্টি বা যানজটের অজুহাতে অতিরিক্ত সার্জ চার্জ আদায়- এসব ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত।

অন্যদিকে, চালকদের অভিযোগও কম নয়। উবারের উচ্চ কমিশন কেটে নেওয়ায় অনেক চালকের কাছে অ্যাপভিত্তিক সেবা অলাভজনক হয়ে উঠছে। রাইড বাতিল বা পেমেন্টসংক্রান্ত বিরোধের জেরে চালক ও যাত্রী-উভয়ের অ্যাকাউন্টই অনেক সময় সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বলছে, রাইড শেয়ারিংয়ের জন্য আলাদা কোনো সেবা শ্রেণি না থাকলেও এটি পরিবহন সেবার আওতায় পড়ে। ফলে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বা সেবা-সংক্রান্ত অভিযোগ সরাসরি কিংবা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে করা যাবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও জরিমানা করার সুযোগ রয়েছে।

এদিকে আট বছর আগে প্রণীত ‘রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা-২০১৭’-এর অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ বিধান এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে খাতটির কার্যকারিতা, তদারকি ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাইড শেয়ারিং সেবাকে প্রযুক্তিনির্ভর ও নিয়ন্ত্রিত করতে ২০১৭ সালে এ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। এতে বিআরটিএর অনুমোদন, সেবা এলাকায় নিজস্ব কার্যালয়, ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ) এলাকায় নিবন্ধিত কমপক্ষে ১০০টি যানবাহন, বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী চালক, ডিজিটাল লেনদেন, জিপিএস ট্র্যাকিং এবং জরুরি (এসওএস) সুবিধা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়।

এ ছাড়া চালকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, অনলাইনে অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তি, বিআরটিএর ওয়েব পোর্টালের সঙ্গে তথ্য সংযুক্তি, প্রতিটি যাত্রার তথ্য সংরক্ষণ, পুলিশ কন্ট্রোল রুমে জরুরি বার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা, অনুমোদিত পার্কিং এবং যাত্রা শুরুর আগেই সম্ভাব্য ভাড়া জানিয়ে দেওয়ার বিধানও রয়েছে। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আট বছর পরও এসব গুরুত্বপূর্ণ শর্তের বড় অংশ বাস্তবায়িত হয়নি।

একাধিক রাইড শেয়ারিং ব্যবহারকারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক চালক অ্যাপে নির্ধারিত ভাড়ায় যেতে রাজি হন না। অতিরিক্ত অর্থ না দিলে তারা রাইড বাতিল করেন। আবার অনেক চালক অ্যাপ বন্ধ রেখে সরাসরি যাত্রী পরিবহন করেন। এতে সরকার যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি যাত্রীর নিরাপত্তা ও জবাবদিহিও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও বাসস্ট্যান্ডে মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির অবৈধ জটলা সৃষ্টি করে যাত্রী তোলার ঘটনাও নিয়মিত। এতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি উবার, পাঠাও ও ওভাইয়ের বিরুদ্ধে চালকদের অসদাচরণ, নারী যাত্রীদের হয়রানি, কার্যকর এসওএস সুবিধার অভাব এবং ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য দেশের বাইরে সংরক্ষণের অভিযোগও রয়েছে।

চাকরিজীবী জাহিদ কামাল বলেন, ‘এখন উবার বা অন্য কোনো অ্যাপ ব্যবহার করা যেন চোখ বেঁধে রাস্তা পার হওয়ার মতো অনিশ্চিত। একই গন্তব্যে ভিন্ন সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাড়া দিতে হচ্ছে।’

দীর্ঘদিন রাইড শেয়ারিংয়ের সঙ্গে যুক্ত চালক কামরুল বলেন, যাত্রীর সঙ্গে কথা কাটাকাটির এক ঘটনার পর তার অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেওয়া হয়। এরপর কয়েক বছর ধরে তিনি অ্যাপ ব্যবহার না করে সরাসরি সড়ক থেকে যাত্রী পরিবহন করছেন।

নীতিমালায় অনুমোদিত স্ট্যান্ড বা পার্কিংয়ের বাইরে যাত্রী সংগ্রহের সুযোগ না থাকলেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিনই রাইড শেয়ারিং যানবাহনের অবৈধ অবস্থান দেখা যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআরটিএর একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, উবার ও পাঠাওসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নীতিমালার শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করছে না। এমনকি সার্টিফিকেট নবায়ন ছাড়াই দীর্ঘদিন সেবা পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত বিভাগ) মো. মাসুম আরেফিন বলেন, ‘ভোক্তা অধিকারে রাইড শেয়ারিং নামে আলাদা কোনো সেবা নেই। এটি পরিবহন সেবার আওতায় পড়ে। অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পেলে আমরা তদন্ত করি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও জরিমানা করা হয়। যাত্রীরা সরাসরি অথবা আমাদের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অভিযোগ করতে পারেন।’

ঢাকা রাইড শেয়ারিং ড্রাইভার্স ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি সজিব হোসেন বলেন, নীতিমালায় স্ট্যাম্প পেপারে চালক, মালিক ও কোম্পানির মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির কথা থাকলেও বাস্তবে অনলাইনে ‘টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনস’ গ্রহণের মাধ্যমেই চুক্তি সম্পন্ন হচ্ছে। অধিকাংশ চালক না বুঝেই এতে সম্মতি দেন। তিনি বলেন, ‘উবারসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সার্ভার দেশের বাইরে থাকায় অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হয় না। চালকদের ট্রেড ইউনিয়নের আওতায় আনা, কমিশন কমানো এবং প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।’

বিআরটিএর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে বিআরটিএর তালিকাভুক্ত রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৯ হলেও সক্রিয় রয়েছে মাত্র তিন থেকে চারটি। নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৩৫ হাজার। এর মধ্যে উবারে ২৬ থেকে ২৭ হাজার এবং পাঠাওতে ৫ থেকে ৬ হাজার যানবাহন রয়েছে। নীতিমালা না মানা বা সার্টিফিকেট নবায়ন না করা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘রাইড শেয়ারিং অনেক ক্ষেত্রে নীতিমালার সীমা ছাড়িয়ে পেশায় পরিণত হয়েছে। চালকদের প্রশিক্ষণ, তথ্য সুরক্ষা, পার্কিং ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর তদারকির ঘাটতি রয়েছে। এসব বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের (আরবান ট্রান্সপোর্ট অনুবিভাগ) অতিরিক্ত সচিব মো. আনিসুর রহমান বলেন, রাইড শেয়ারিং নীতিমালা হালনাগাদের কাজ চলছে। বিদ্যমান নীতিমালাকে সময়োপযোগী করে সেবাকে আরও সুশৃঙ্খল ও জবাবদিহিমূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে নীতিমালা না মানা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


-সুমন/টিএস


Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝