২০ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ২০টি প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এসব প্রস্তাব নিয়ে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সদস্যরা বিভিন্ন প্রশ্ন তুললেও জ্বালানি বিভাগ সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। ফলে প্রস্তাবগুলো পুনর্বিবেচনা করে পূর্ণাঙ্গ তথ্যসহ আবার উপস্থাপনের পরামর্শ দেয় কমিটি। এরপর এসব প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়।
সচিবালয়ে গতকাল মঙ্গলবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি। ডিজেল আমদানির প্রস্তাব প্রত্যাহারের বিষয়ে জানতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি একটি বৈঠকে থাকায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানান, প্রস্তাবগুলোর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে বেশ কিছু অসংগতি থাকায় কমিটির সদস্যরা একাধিক প্রশ্ন তুললেও জ্বালানি বিভাগ তার সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি। এজন্য আরও পর্যালোচনা করে ফের উপস্থাপনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এসব প্রস্তাবের বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট সংঘাতের সময় সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সরবরাহের প্রস্তাব আসে। বিপিসি সেগুলো যাচাই-বাছাই করে প্রস্তাব আকারে জ্বালানি বিভাগে পাঠায়। পরে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির নীতিগত সিদ্ধান্তের জন্য উপস্থাপন করা হয়। অনেক প্রস্তাব একসঙ্গে আসায় সদস্যরা বলেছেন, যদি আরও কোনো প্রস্তাব থাকে তাহলে সবগুলো একসঙ্গে পর্যালোচনা করে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ কারণেই ফের উপস্থাপনের জন্য রাখা হয়েছে।
টানা দুই সপ্তাহ প্রস্তাব অনুমোদন না হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে কোনো সংকট তৈরি হবে কি না– এমন প্রশ্নের জবাবে মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, দেশের জ্বালানি তেলের নিয়মিত আমদানি আগের মতোই চলায় তাৎক্ষণিক কোনো সমস্যা হবে না। সরকার দুটি পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল কিনে– ওপেন টেন্ডার মেথড (ওটিএম) এবং সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তি। তাই এগুলো অনুমোদনে কিছুটা সময় লাগলেও সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকট সৃষ্টি হবে না।
দেশে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দর প্রস্তাব নিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) যাচাই-বাছাই ও দরকষাকষির মাধ্যমে তা গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করে। এই প্রস্তাবের আওতায় ওমান, নাইজেরিয়া, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, হংকং, কাজাখস্তান, দুবাই ও চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মোট ১৯ লাখ ৭৫ হাজার টন ডিজেল আমদানির নীতিগত অনুমোদন চাওয়া হয়েছিল।
গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকেও একই ধরনের অন্তত ১৫টি প্রস্তাব উপস্থাপনের কথা ছিল, তবে শেষ পর্যন্ত সেগুলো প্রত্যাহার করা হয়। প্রস্তাবগুলোর আওতায় ১৭ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় ১৬ লাখ টন ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা ছিল। ফলে টানা দুই সপ্তাহে প্রায় ২০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ আটকে গেল। জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত নতুন করে অনুমোদন না মিললে ভবিষ্যতে সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে বৈঠকে কিছু প্রস্তাবের নীতিগত অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গুনভর ইউএসএ এলএলসি থেকে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) পদ্ধতিতে ২০২৬ থেকে ২০৩৯ সাল পর্যন্ত ১৩ বছর মেয়াদে প্রতি বছর ছয় কার্গো করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির প্রস্তাব প্রক্রিয়াকরণের অনুমোদন পায়।
বর্তমানে জিটুজি ভিত্তিতে কাতার, ওমান, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মোট সাতটি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ এলএনজি আমদানি করছে। এছাড়া মহেশখালীতে এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ টার্মিনাল স্থাপনের লক্ষ্যে চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের প্রস্তাবটিও জিটুজি পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াকরণের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।