ঢাকায় চীনা দূতাবাসে ই-মেইলের মাধ্যমে হামলার হুমকির ঘটনায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। ঘটনার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ও পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা।
গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার (১৯ আগস্ট) রাতে একটি উগ্রবাদী সংগঠনের নামে ই-মেইল করে চীনা দূতাবাসে হামলার হুমকি দেওয়া হয়। বিষয়টি জানার পর দূতাবাসের নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশ ও চীনা দূতাবাসের কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। এ নিয়ে একপর্যায়ে হট্টগোলের ঘটনাও ঘটে বলে দাবি করেছে একাধিক গোয়েন্দা সূত্র।
সূত্র জানায়, পরদিন বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ঢাকার বারিধারায় চীনা দূতাবাসে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সিটিটিসির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মুন্সি শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি প্রতিনিধি দল রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সঙ্গে বৈঠক করে।
বৈঠকে পুলিশ সদর দপ্তরের এলআইসি শাখার এডিসি মাহমুদ এবং বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকল্পে কর্মরত অন্তত ১০ জন চীনা নাগরিক উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, হামলার হুমকি পাওয়ার পর বিষয়টি পুলিশ সদর দপ্তর ও সিটিটিসিকে অবহিত করে দূতাবাস কর্তৃপক্ষ। পরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করতে দূতাবাসে যান পুলিশ কর্মকর্তারা।
চীনা দূতাবাসের বৈঠকের পর জাপানি দূতাবাসেও বৈঠক করেন সিটিটিসির কর্মকর্তারা। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ৪০ মিনিট থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত বারিধারায় জাপানের দূতাবাসে দেশটির রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচির সঙ্গে বৈঠক করেন সিটিটিসির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মুন্সি শাহাবুদ্দিন।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরে পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট এসব বস্তু নিষ্ক্রিয় করে।
এর মধ্যে রাজধানীর ডেমরা এলাকায় দুটি বোমাসদৃশ বস্তুসহ এক যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তদন্তে ওই যুবকের জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তিনি ‘মামুন ওরফে বোমা মামুন’-এর ঘনিষ্ঠ বলেও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে মামুনের অবস্থান এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।
গোয়েন্দা সূত্র আরও জানায়, কারাগারে তাদের মধ্যে যোগাযোগের পর জামিনে বের হয়ে সংশ্লিষ্টরা আত্মগোপনে চলে যান। এর মধ্যে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে আল-কায়েদার নেটওয়ার্ক নিয়ে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। এরপর দেশের উগ্রবাদী তৎপরতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
চীনা দূতাবাসে হামলার হুমকির বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিটিটিসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, খবর পাওয়ার পর পুলিশ কর্মকর্তারা দূতাবাসে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ই-মেইলটি কারা এবং কোন সংগঠনের পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছে, তা শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, দূতাবাসের নিরাপত্তার দায়িত্ব ডিপ্লোমেটিক জোনের পুলিশের। তারা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।
এদিকে দূতাবাসের নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশ ও চীনা কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষের বিষয়টি নিয়েও আলোচনা চলছে বলে সূত্র জানিয়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশ ও কূটনীতিকদের মধ্যে একাধিক দফায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিষয়ে জানতে ডিএমপির ডিপ্লোমেটিক সিকিউরিটি বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) সৈয়দ মোহাম্মদ ফরহাদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
চীনা দূতাবাসে হামলার হুমকির পর ঢাকায় বিদেশি কূটনীতিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে তৎপর হয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। গুলশান, বারিধারাসহ বিদেশি নাগরিকদের বসবাসের এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, ঢাকায় অবস্থিত বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে হামলার হুমকি দেওয়া ব্যক্তিদের বা সংগঠনকে শনাক্ত এবং তাদের অবস্থান জানার চেষ্টা চলছে।
তবে হামলার হুমকির উৎস, এর বিশ্বাসযোগ্যতা এবং এর সঙ্গে কোনো উগ্রবাদী সংগঠনের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না-এ বিষয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে একটি গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তদন্ত ও নিরাপত্তা তৎপরতা এখনও চলমান রয়েছে।
টিএস