ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
১৩ দিনেই ৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকা ঋণ: বাড়ছে সরকারের ব্যাংকনির্ভরতা
✎ অবজারভার অনলাইন ডেস্ক
⏲ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ৭:১৮ পিএম
X

রাজস্ব ঘাটতির চাপে নতুন অর্থবছরের শুরুতেই ব্যাংক ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে সরকার। অর্থবছরের শুরুতেই সরকারি ব্যয় নির্বাহে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ১৩ দিনেই সরকার ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়েছে ৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থবছরের শুরুতে সরকারের স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে রাজস্ব আহরণে ঘাটতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে সরকারি ব্যয় মেটাতে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

কোথা থেকে এলো ৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকা

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সরকারের নেওয়া মোট ঋণের মধ্যে ৫ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এবং ৩ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা এসেছে তফসিলি ব্যাংকগুলো থেকে।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া অর্থের পুরোটা এসেছে ওয়েজ অ্যান্ড মিনস অ্যাডভান্স (Ways and Means Advance) সুবিধার আওতায়। সরকারের দৈনন্দিন আয় ও ব্যয়ের সাময়িক ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ ব্যাংক এই স্বল্পমেয়াদি ঋণ দিয়ে থাকে। সাধারণত ৯০ দিনের মধ্যে এ ঋণ পরিশোধ করতে হয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এ ধরনের ঋণ নেওয়া কার্যত নতুন টাকা সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থায়নের সমতুল্য।

ব্যাংক ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা

সরকারের ব্যাংক ঋণের চাপ গত এক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ব্যাংক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮৫ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছর শেষে এ ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫০ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা।

অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সরকারের ব্যাংক ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।

শুধু তাই নয়, গত দুই অর্থবছরেই ব্যাংক ঋণের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে সরকার।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক থেকে নিট ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বছর শেষে নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।

এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে সরকার ঋণ নেয় ১ লাখ ১৯ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা।

রাজস্ব আদায়ে ঘাটতিই বড় কারণ

সরকারের ব্যাংক ঋণ বাড়ার পেছনে অন্যতম কারণ রাজস্ব আহরণে ঘাটতি।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও ব্যাংক খাত বিশ্লেষক হেলাল আহমেদ জনি বলেন, বাজেটে যে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, বাস্তবে তা অর্জিত না হওয়ায় সরকারি ব্যয় পরিচালনায় অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণের প্রয়োজন হচ্ছে।

তিনি বলেন, অর্থবছরের শুরুতে সরকারের ব্যাংক ঋণ কিছুটা বাড়লেও তা যেন বাজেটে নির্ধারিত সীমা অতিক্রম না করে। ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে কর-ভ্যাট আদায় এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা।

অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা কম রাজস্ব সংগ্রহ হয়েছে।

বেসরকারি খাতে চাপের আশঙ্কা

সরকারের ব্যাংক ঋণ বৃদ্ধি বেসরকারি খাতের জন্য নতুন চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়ায় সরকারের নগদ অর্থের চাপ বেড়েছে। উন্নয়ন ব্যয়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটাতে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

তবে এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, সরকার বড় পরিমাণে ব্যাংক ঋণ নিলে ব্যাংকগুলোর অর্থের একটি বড় অংশ সরকারি খাতে চলে যেতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, কর প্রশাসনের সক্ষমতা উন্নয়ন এবং সরকারি ব্যয়ে আরও শৃঙ্খলা আনার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।

‘মন্দের ভালো’ বিকল্প ব্যাংক ঋণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংক থেকে প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

তার মতে, রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলে সরকারের বিকল্প অর্থসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। তখন বৈদেশিক ঋণ, বন্ড ও সঞ্চয়পত্রের পাশাপাশি শেষ পর্যন্ত ব্যাংক ঋণের ওপরই বেশি নির্ভর করতে হয়।

অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম বলেন, ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার বা ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট তৈরির ঝুঁকি রয়েছে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় এটি তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য বিকল্প।

কারণ, মূল্যস্ফীতির কারণে সঞ্চয়পত্র থেকে প্রত্যাশিত অর্থ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে টাকা ছাপিয়ে অর্থসংস্থান করলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, সরকার একদিকে বৈদেশিক ঋণ সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত টাকা না ছাপিয়ে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়ে ব্যয় নির্বাহ করছে। সবদিক বিবেচনায় বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংক ঋণনির্ভর অর্থসংস্থানকে ‘মন্দের ভালো’ বিকল্প বলা যায়।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রাজস্ব ব্যবস্থাপনা

সরকারের জন্য এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা নিয়ন্ত্রণে রাখা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থ ব্যবস্থাপনার জন্য কর আদায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং বিকল্প অর্থসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।

আরএন


Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝